Thursday , September 21 2017
হোম / উপ-সম্পাদকীয় / সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও তার প্রতিকার

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও তার প্রতিকার

Upo-sompadokio

সুমা আক্তার : বাংলাদেশ কিংবা উন্নয়নশীল দেশসমূহ কেবল নয়, বরং বিশ্বজুড়ে দুর্নীতি আজ উন্নয়নের পথে একটি প্রধান বাধা। দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের সাথে সাথে বাড়ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারছে না, দেখা দিচ্ছে সুশাসনের অভাব। সাম্প্রতিককালে দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণদানের জন্য যেসব শর্ত আরোপ করছে তার মধ্যে সুশাসন অন্যতম। বলার অপেক্ষা রাখেনা, দুর্নীতি রোধ ছাড়া সুশাসনের পথ প্রশস্ত করার কোনো উপায় নেই। কাজে সহায়তা করার জন্যই বিভিন্ন সেবাখাত। এখানে সরকারীভাবে জনবল নিয়োগ দেয়া হয় যাতে  মানুষ সেবা  পায়, হয়রানির শিকার হতে না হয় কাউকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ক্ষেত পাহারার জন্য যে বেড়া দেওয়া  হয় সেই বেড়াই একসময় ক্ষেতের ফসল খেতে শুরু করে। আমাদের  সেবাখাতগুলোর চিত্রও এখন এ পর্যায়ে। সাধারণ মানুষের দোরগোরায় সেবা পৌঁছে দেয়ার কথা শুধু শ্লোগান সর্বস্ব হয়েই থাকছে।  সরকার নির্ধারিত যে কোনো সেবা পাওয়া মানুষের অধিকার । মানুষের ভোগান্তি দূর করার এবং তার বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরের বিষয়। সহজে নির্বিঘ্নে যে কোনো সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে এখনো অলীক স্বপ্নই আমাদের  দেশে। কারণ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান ঘুষ, দুর্নীতি, ও স্বজনপ্রীতি।
সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি একটি বহুল আলোচিত শব্দ। ব্যাপক আলোচনা ও বাস্তবতায় এর মূল অর্থ দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থলাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার  (Abuse of power for personal gain)|  Social Work Dictionary- তে  দুর্নীতির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে, “রাজনৈতিক ও সরকারি প্রশাসনে সাধারণত ঘুষ,বলপ্রয়োগ,ভয়প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনই দুর্নীতি।”
ওপরের সংজ্ঞানুযায়ী নিম্নোক্ত কার্যাবলীকে দুর্নীতি বলা যায় : ১. ক্ষমতার অপব্যবহার, ২. ঘুষ, ৩. আত্মসাৎ, ৪. ভীতি প্রদর্শন করে  কোনো স্বার্থ আদায়,  ৫. প্রতারণা, ৬. প্রভাব বিস্তার, ৭. স্বজনপ্রীতি, ৮ সম্পদের অপব্যবহার, ৯. দায়িত্ব পালনে অবহেলা।
জাতীয় উন্নয়ন ও দুর্নীতি : সাধারণভাবে জাতীয় উন্নয়ন বলতে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বোঝায়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন দীর্ঘ দেড় দশক ‘উন্নয়ন তত্ত¡’ চর্চা করার পর উপলব্ধি করছেন যে, শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কোনো দেশের মাপকাঠি হতে পারে না। কেননা মাথাপিছু আয় বাড়লেও সেই বাড়তি আয়ে জনসাধারণের একটি বড় অংশের কোনো অধিকার নাও থাকতে পারে। তার মতে, কেবল উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি নির্ভর অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্থহীন উন্নয়নে পর্যবসিত হতে বাধ্য, যদি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নসহ আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোর ইতিবাচক উন্নয়ন না হয়। আর আমাদের অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি সীমাহীন।
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি: সরকারি কর্মকর্তা, কমচারীরা ঘুষ ছাড়া তাদের দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করতে পারে না। তারা নিজেরা ও জানেনা তারা কতটা নিচে নামছে। তারা এটাকে ঘুষ হিসেবে দেখছে না ভাবছে তাদেরকে বকশিস দেওয়া হচ্ছে। তারা একে অন্যের  সাথে প্রতিযোগিতা করে ঘুষ নিচ্ছে। আর তাদের এই নির্মম প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে আপামর জনগণ। আমাদের দেশে একটা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের পদের জন্য ২ লাখ, একটা কনস্টেবলের পদের জন্য ৫ লাখ আর স্বাস্থ্যকর্মীর পদের জন্য ৩ লাখ  টাকা প্রয়োজন। এর ফলে যারা মাঝারি মানের মেধাবী তারা আর চাকরির আশা করতে পারে না। কারণ তারা একটা চাকরির জন্য এত টাকা সরবরাহ করার সামর্থ্য রাখে না। কিছু ব্যতিক্রম যারা খুব বেশি মেধাবী তারা আবার অনার্স, মাস্টার্স করে আরেকটু ভালো কিছু আশা করে। এর ফলে যারা প্রাথমিক  বিদ্যালয়ে ঘুষ দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রবেশ করে তারা কি করে “ আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ”নির্মাণের কারিগর হতে পারে? অর্থাৎ আমাদের মূল ভিত্তিটাই দুর্বল রয়ে  গেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। আজ বাংলাদেশ এই অপবাদকে অনেক কৃতিত্বের সাথে গুডবাই জানিয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সরকারিভাবে শ্রীলঙ্কায় চালও রপ্তানি করেছে।  বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে যেমন CPA(Commonwealth Parliamentary Association), IPU( Inter Parliamentary Union). বাংলাদেশ গউএ এর  শর্ত পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নতুন করে ঝউএ কার্যকর করতে যাচ্ছে। জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বেড়েছে এউচ, এমন কি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এউচ ৬ এর ঘরে বর্তমানে তা ৭.০৫ যা উন্নয়নের একটি অপরিহার্য দিক। সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যে বিরোধ ছিলো সমুদ্রসীমা নিয়ে তাও কৃতিত্বের সাথে সমাধান করেছে। ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছে। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। বাংলাদেশ তার নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগ নিয়েছে। দাতা গোষ্ঠীদের  দেয়া বিভিন্ন লোভনীয় শর্ত থেকে বেড়িয়ে এসেছে। অবশ্য দাতাগোষ্ঠীরা নিজেরাই তাদের কথা আগে বরখেলাপ করেছে।  সবকিছুই পজিটিভ। দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বের মানচিত্রে উজ্জ্বল করতে এই সমস্ত সফলতা যেমন একধাপ এগিয়ে দেয় ঠিক তেমনি কিছু অসাধু, স্বার্থান্বেষী মহলের কুকর্ম দেশের মুখে কালিমা লেপন করে দেয়। সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করে দিয়েছেন যা বর্তমান অর্থবছর থেকেই কার্যকর হয়েছে। বেতন-ভাতা দ্বিগুণ না দু’শ গুণ করলেও যাদের উপরি খাওয়ার অভ্যাস তারা তাই করবে। তারা তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থটাকেই মূখ্য করবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ দেখার সময় কোথায় তাদের? তারা তো নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। অথচ তাদের বেতনের টাকা আসে কোথা থেকে? জনগণের রক্ত পানি করা করের টাকায় তাদেরকে বেতন দেয়া হয়। আর এই জনগণ যখন কোনো একটা কাজে সরকারি অফিসে যায় তাহলে তাদেরকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। সে ভূমি অফিস থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতাল কোন জায়গায় জনগণ নির্বিঘেœ সেবা পাচ্ছে সেটা জানতে খুব ইচ্ছে করে। সরকারি অফিস আদালতে গেলে জনগণ হারে হারে টের পায় কাকে বলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা? কাকে বলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য?
নি¤েœ সরকারি কিছু সুনির্দিষ্ট খাতের দুর্নীতির চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হলো:
১। আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় দুর্নীতি : বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান বাহিনী পুলিশ। কিন্তু পুলিশ সম্পর্কে জনগণের ধারণা অত্যন্ত নেতিবাচক। ডেমোক্রেসিওয়াচ-এর এক জরিপ থেকে জানা যায়, দেশের ৯৫% মানুষ মনে করে পুলিশ দুর্নীতিপরায়ণ। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন রিপোর্টেও পুলিশের দ্বারা ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানারকম দুর্নীতির চিত্র বিবৃত হয়েছে। সংবাদপত্রসমূহে পুলিশের দুর্নীতির ব্যাপক চিত্র প্রায়ই প্রকাশিত হয়। দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতীয় স্বার্থের চেয়ে নিজস্ব ব্যক্তিস্বার্থকেই বড় করে দেখে। ফলে আইনের শাসন ব্যাহত এবং জাতীয় উন্নয়ন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
২। শিক্ষাখাতে দুর্নীতি : শিক্ষাখাত বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম বৃহৎ খাত। মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় চার দশকেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সর্বজনীন, গণমুখী এবং জাতির মেরুদন্ড গঠনে সহায়ক হতে পারেনি। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও প্রসার নিয়ে কাগজে-কলমে বিস্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, ব্যয় করা হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। অরাজাকতা, অনিয়ম এবং সর্বব্যাপী দুর্নীতি শিক্ষা নামক জাতির মেরুদন্ডকে সুদৃঢ় করতে পারেনি। এই খাতে দুর্নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, মার্কশিট জালিয়াতি, ‘ডোনেশন’-এর নামে ঘুষ আদায় এবং ছাত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় ইত্যাদি। স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থাকায় শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বহুবিধ দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এমতাবস্থায় জাতীয় উন্নয়নের বিষয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
৩। স্থানীয় সরকারখাতে দুর্নীতি : স্থানীয় সরকার খাতও সরকারে অন্যতম বৃহৎ খাত। স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকার স্থানীয় সরকার খাতকে শক্তিশালী করার জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে স্থনীয় সরকার খাতকে তিন স্তরে বিভক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপক দুর্নীতির কারণে এই খাত কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জন করতে পারছে না। এই খাতের উপ-খাতের আওতাধীন অফিসগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, জবাবদিহিতা ও তদারকির অভাব এবং ক্যাডার সার্ভিস দ্ব›েদ্বর কারনে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় এবং দুর্নীতি হচ্ছে, জনগণ কোনো কার্যকর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। জবাবদিহিতা এবং তদারকি না থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং ওয়াসার অবস্থান  সর্বশীর্ষে।


সম্প্রতি একটা জাতীয় দৈনিকে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর পাহারসম দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হলে ঐ কথিত প্রকৌশলী ৫০/৬০ জন গুন্ডা পান্ডা নিয়ে উক্ত দৈনিক পত্রিকার অফিসে হামলা করে। তার এহেন আচরন শুধু বর্বরোচিতই ছিলনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ, কিন্তু প্রশাসন নির্বিকার। ভবন তৈরীতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অনিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রকৌশলীদের নির্মাণকাজের ‘কোড অব এথিকস’ মেনে চলার আহবান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার চাকুরী না গিয়ে শুধু বদলিই করা হচ্ছে।


অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরকারি সহায়তার ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা, টিআর ইত্যাদি গ্রামীণ কর্মসূচির আওতায় দেয়া বরাদ্দের অধিকাংশই আত্মসাৎ করে থাকেন। এমতাবস্থায় জাতীয় উন্নয়ন বিষয়টি সুদূর পরাহত।
৪। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র অত্যন্ত নাজুক। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে উন্নয়ন বাজেটের হিসাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ ব্যয় করা হলেও দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতি সমগ্র স্বাস্থ্যব্যস্থায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্য সেবাকে বিঘিœত করছে। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিভিল সার্জন অফিস এবং পরিবার কল্যাণসহ সার্বিক স্বাস্থ্যখাত দৃশ্যত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। দেশের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যেগুলো তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা  প্রদান করার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেগুলো দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে রোগীদের সেবা না করে নিজস্ব ক্লিনিক পরিচালনা  করা , কমপ্লেক্সে অনুপস্থিত থাকা, হাসপাতালে বসে ফি নিয়ে চিকিৎসা করা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে রোগী ভর্তি, রোগীদের জিম্মি করে কমিশন আদায়, প্যাথলোজিক্যাল টেস্টের জন্য অর্থ আদায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পদেই দুর্নীতি হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে এই খাতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা এবং দায়িত্বে অবহেলার ঘটনাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া গতবছর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন একটা বিষয়। এমন ঢালাওভাবে আর কখনোই প্রশ্ন ফাঁস হয়নি, হতো গোপনে। এর ফলে এখন কি হয়েছে? জাতি কিছু ভবিষ্যৎ মেধাবী চিকিৎসকের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। আর এই ন্যক্কারজনক ঘটনা কোমলমতি মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎটাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দিলো। আর যে জায়গাটা মেধাবীদের পাওয়ার কথা সেটা পেল যাদের বাবার টাকা আছে । এমতাবস্থায় জাতি কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা আশা করতে পারেনা।
৫।বন ও পরিবেশ খাতে দুর্নীতি : বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ খাতে দুর্নীতি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। বন বিভাগের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র সমগ্র দেশে বনভূমির গাছ কেটে উজার করে দিচ্ছে। সুন্দরবন, ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের বনাঞ্চলে গাছ কাটার এবং কাঠ পাচারের ‘মহোৎসব’ চলছে। অনেকটা খোলামেলাভাবেই এই অবৈধ কাজটি করা হচ্ছে। কখনও কখনও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বন বিভাগের হাজার হাজার একর জমি অবৈধভাবে ইজারা দিচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর ৩৭ হাজার একর বনভূমি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। বন বিভাগের দুর্নীতি বলতে  বন অধিদপ্তরের দুর্নীতিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। তাছাড়া এ অধিদপ্তরে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্পদের অপব্যবহারের ঘটনাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি খাতেই কম বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। ফলে জাতীয় উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তার মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন অন্যতম। ২০০৪ সালের নভেম্বরে এ কমিশন গঠিত হলেও কোনো সরকারের আমলেই প্রতিষ্ঠানটি তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।  কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারার মূল কারণ : রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ,
সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতপার্থক্য, সহায়তা প্রদানে অনীহা, পদের লোভ, অর্থবিত্তের পাহার গড়ার নেশা
দুর্নীতি দমনে পরামর্শ : বাংলাদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতাসংস্থা গত কয়েক বছর ধরে সরকারকে দুর্নীতি হ্রাস করার উপায় হিসেবে অনেক পরামর্শ দেিয়ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও তাদের প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট এবং সেমিনারে দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকেরাও বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। নিচে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনে সম্ভাব্য করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:
১. দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করা : ২০০৪ সালে কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য পুরোপুরি স্বাধীন এবং পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ২০০৪-২০০৬ সময়কালে এটি তেমন কার্যকর ছিলো না। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের শাসনামলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেখা গেছে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। বর্তমান সরকার  ক্ষমতাসীন হয়ে কমিশনকে আরও বেশি কার্যকর করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে কমিশন যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পূর্বানুমতি ছাড়াই দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এখনও আশানুরূপ সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
২. প্রশাসনিক সংস্কার : জনপ্রশাসনে সংস্কার দুর্নীতি কমাতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের সতত পরিবর্তনশীল চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দুর্নীতিমুক্ত সমাজের জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সৃষ্টি :  স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত। সরকারের প্রতিটি কাজে যদি স্বচ্ছতা থাকে এবং জনগণ যদি সরকারের সিদ্ধান্ত এবং কর্মকান্ড সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পায় তাহলে দুর্নীতির সুযোগ অনেক কমে আসবে। একই সাথে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি নিজেদের কাজের জন্য জবাবদিহিতায় বাধ্য থাকেন তাহলেও দুর্নীতি থেকে উত্তরণ অনেকাংশে সম্ভব। এজন্য ১৯২৩ সালের ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট’ বাতিল করতে হবে।
৪. ন্যায়পাল নিয়োগ : সংবিধানের ৭৭নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়ে ন্যায়পাল পদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা  বর্তমানে বিলুপ্ত।
৫. আলাদা বিচারালয় : তদন্ত থেকে শুরু করে রায় ঘোষণা পর্যন্ত দুর্নীতি মামলায় বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। মামলার এই দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম প্রধান কারণ আদালতের স্বল্পতা বা পর্যাপ্ত বিচারকের অভাব। তাই দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনার জন্য আলাদা বিচারালয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ দুর্নীতির মামলা দ্রæত সুরাহা না হওয়া দুর্নীতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
৬. শাস্তি : দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের দেশে শাস্তির ব্যবস্থা অপ্রতুল। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতির জন্য বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক বরখাস্ত বা বদলির আদেশ দেয়া হয়। সাময়িক দরখাস্তপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেন-দরবার করে পুনরায় চাকরিতে বহাল হন। আর শাস্তি হিসেবে ‘বদলি’ কতটুকু কার্যকর Ñতাও বিবেচনা করে দেখার দাবি রাখে।
৭. সুশীল সমাজের ভূমিকা : দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের। সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে দুর্নীতিরবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
৮. গণমাধ্যমের ভূমিকা : বিশ্বব্যাংকের Working Paper `The Media’s Role in Curbing Corruption’- এ বলা হয়, The role of the media is critical in promoting good governance and controlling corruption. It  not only raises public awareness about corruption, its causes, consequences and possible remedies but also investigates and reports incidences of corruption. দুর্নীতি দমনে গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমসমূহ কার্যকর অস্ত্র হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি যে কোনো দেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তাই দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সর্বত্র সততার একটি  আবহ, স্বচ্ছতা ও জবাবাদিহিতার একটি পরিমÐল। প্রতিটি ব্যক্তি যদি তার কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছ থেকে সততার সঙ্গে স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে যদি জনগণ ও তার কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবাদিহি করানো যায়, তাহলে দুর্নীতি থেকে দেশবাসী রক্ষা পেতে পারে। এর ফলে দেশে যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে, তেমনি জাতীয় উন্নয়নও তরান্বিত হতে পারে।

Check Also

ওরা আর হাসবে না

অনলাইন ডেস্ক : সেনারা বোমা মেরে বাড়ি উড়িয়ে দিয়েছে। বোমা মারা আগেই আমরা বাড়ি থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *