Saturday , September 23 2017
শিরোনাম
হোম / শিল্প ও সাহিত্য / ব্রিটেনে বৈশাখী মেলা : ব্রিট-বাঙালির সেতুবন্ধন

ব্রিটেনে বৈশাখী মেলা : ব্রিট-বাঙালির সেতুবন্ধন

ঢাকার ডাক ডেস্ক

Boishaki-Stage20160529112911

যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্রিটেনে বাঙালিদের বৈশাখী আয়োজনটা বেড়েছে। বিভিন্ন শহরে বৈশাখ নিয়ে মানুষ ইনডোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। প্রতিবছর এ আয়োজনটা বাড়ছে। কার্যত দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে ব্রিটেনে বাঙালিদের প্রিয় এলাকা ইস্ট লন্ডনে বৈশাখী মেলা।

বাঙালিদের এ মেলাটি দীর্ঘদিন থেকেই একটি প্রাণের মেলা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সারা ব্রিটেনের বাঙালিদের মাঝে। লাখো মানুষের ঢল নামতো এই মেলায়। ব্রিকলেনকে ঘিরে এই মেলার আয়োজনটি থাকতো পাশ্ববর্তী বিশাল পার্কে। প্রতিবছরই এ মেলা জানান দিতো বাঙালির ঐতিহ্যিক চির আনন্দের। কিন্তু এই আনন্দ কিংবা বাঙালিত্বকে মেনে নিতে পারেনি ব্রিটেনে বসবাসরত কতিপয় প্রতিক্রিয়াশীল বাংলাদেশি রাজনীতির স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। মেলাতে নিয়ে আসে তারা ধর্মীয় অনুশাসনের মিথ্যে বেসাতি। মেলা চলাকালীন সময়ে এরা প্রায়ই লিফলেট আর হ্যান্ড মাইক নিয়ে মেলার বিরুদ্ধে ধর্মের বার্তা পৌঁছায়। কিন্তু তবুও মেলা বন্ধ হয়নি। তবে তারা মেলাকে ব্রিকলেন তথা বাঙালিদের এলাকা থেকে অন্যত্র নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। তারা লোকজনের উপস্থিতি কমাতে পরিকল্পিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এতে কিছুটা সফলতাও পেয়েছে।

Boishaki

গেলো দু’একটি বছর ক্রমেই লোকজনের উপস্থিতি হ্রাস পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মেলার আয়োজন ব্রিকলেন থেকে দূরে সরানোর দায় পদচ্যুত টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমান এড়াতে পারবেন না। তার সময়েই এটা হয়েছে। মৌলবাদীদের আশির্বাদপুষ্ট তকমা পাওয়া মেয়র লুৎফুরের পর নির্বাহী মেয়র হিসেবে জন বিগস এসে এই মেলাকে ব্রিকলেনে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণেই এই মেলাটি গত ২২ মে নির্ধারণের পরও হঠাৎ করে মেলা স্থগিত হয়ে যায়। তবে সব সন্দেহ আর শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে মেলার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে আগামী ৩১ জুলাই। তা ব্রিকলেনকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে। বিলম্বে হলেও কোনো প্রকার অঘটন ছাড়া যদি এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে যায়, নিঃসন্দেহে তা হবে আরেকটি সফলতা টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগসের।

২.
বৈশাখ বাঙালির একটা চেতনার নাম। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সারা দেশই সাজে। ভেতরে ও বাইরে উৎসবে মেতে ওঠে ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতী, পুরুষ আর মহিলারা। কিন্তু ব্রিটেনে সে অবস্থাটা হবার নয়, কারণ আবহাওয়া এখানে বিরুপ থাকে। পুরোপুরি গ্রীষ্মকাল না আসলে বাইরে এরকম একটা মেলা করার চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু এরপরও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থান সাজানো হয়েছিলো। উদযাপিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ এখন এদেশে বেড়ে ওঠা বাঙালি ছেলে-মেয়েরাও জানে। তারা জানে এটা একটা উৎসবের দিন। সংস্কৃতি আর আবহমান ঐতিহ্যের ব্যাপক ব্যাখ্যা এদের প্রয়োজন নেই। এরা জানে ওইদিনটাকে কেন্দ্র করে উৎসব হতে হয়। এখানে বাঙালিয়ানা হয়। সুতরাং এসব উৎসবে চোখে পড়ে অসংখ্য ব্রিট-বাঙালি ছেলে-মেয়েদের উপস্থিতি। ফলে কোন দিন এ উৎসব হচ্ছে, তা এখন আর ধর্তব্য নয়।

Boishaki

ব্রিটেনে খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠান করতে হলে বাংলাদেশের বৈশাখ মাসটি শেষই হয়ে যায়। কনকনে বাতাসে কিংবা বৃষ্টিস্নাত ছোট্ট দিনকে আমরা নিতে পারি না আমাদের বৈশাখী উৎসবের দিন হিসেবে, অন্তত আউটডোরে। সেজন্যেই ব্রিকলেনের উৎসবের দিকে চেয়ে থাকে ব্রিটেন এমনকি ইউরোপের বাঙালিরা। কিন্তু এ বছর ব্রিকলেনের মেলা হবার আগেই আরেকটা বিশাল মেলা হয়েছে বার্মিংহামে। বার্মিংহামের স্মলহীথ পার্কে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছে। এটা ছিলো বার্মিংহামের পার্কে প্রথম এত ব্যাপক আকারের মেলা।

গত ৮ মে অনুষ্ঠিত এই মেলা ছিলো রোদ্রোজ্জ্বল। শুধু এই ঔজ্জ্বল্যই এনে দিয়েছে তাদের এক বিরাট সাফল্য। মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি অনুযায়ী স্টলগুলো সমৃদ্ধ ছিলো না। মঞ্চে ছিলো না কোন আকর্ষণ। সাউন্ড সিস্টেম ভালো ছিলো না। তবে জেনেছি, এই মেলা ভণ্ডুল করতে লন্ডনের সেই প্রেতাত্মারাও চেষ্টা করেছে। তাদের মঞ্চ তৈরিই করতে হয়েছে মেলার দিন সকালে। বেবী নাজনীন গান গেয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে গান গাইতে আসলে কোনো কোনো শিল্পী মনে করেন, তা যা-ই করবেন তা-ই মানুষ খাবে। সেজন্য বাউল কিংবা শাহ আব্দুল করিমের গান শুনতে আসা উন্মুখ দর্শকদের জন্য তিনি গাইলেন রবীন্দ্রসংগীত। মঞ্চের দিকে মানুষ মুখ করে থেকেছে, কিন্তু খুব একটা প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি মেলা কমিটি। কিন্তু তবুও বার্মিংহামের এই মেলাটি একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। শুধু কয়েকজন মিডিয়াকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মেলার আয়োজনকে আমরা শতভাগ সার্থকতা হিসেবেই ধরে নিতে পারি। প্রথম মেলায় কিছুটা ত্রুটি থাকবেই। এটাকে আমরা কোনোভাবেই ব্যর্থতা বলতে পারি না। আমরা আশাবাদী, লন্ডনের বাইরে একটা ধারা সৃষ্টি করলো বার্মিংহাম।

সেই একই ধারায় গত ১৫ মে ম্যানচেস্টারেও হয়ে গেলো একটা ভিন্ন আয়োজন। মেলার আদলেই, তবে পরিসর ছিলো ছোট্ট। তাই নাম দেয়া হয়েছিলো ‘বৈশাখী আনন্দ উৎসব’। চেতনা নামের একটা সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। ম্যানচেস্টারে এই প্রথম কোনো পার্কে বৈশাখ নিয়ে এরকম উৎসব হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। ‘চেতনার বৈশাখী আনন্দ’র সাথী হয়েছিল ম্যানচেস্টারের অগণিত মানুষ। হাইড থেকে এসেছিল শিশু-কিশোর-কিশোরীসহ অনেক অনেক নারী-পুরুষ। এসেছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বিভিন্ন শহর থেকে। অতিথি হয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি ইভান লুইস। এই আয়োজনের শুরু থেকেই আন্তরিক সহযোগিতা দিয়েছেন জনপ্রতিনিধি কাউন্সিলর লুৎফুর রহমান, ছিলেন আরও তিনজন কাউন্সিলর আহমদ আলী, আবিদ চৌহান ও জাহরা আলজা। ম্যানচেস্টারের সংস্কৃতিকর্মী আর মিডিয়াকর্মীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি উদ্যোক্তাদের সাহস জুগিয়েছে।

Boishaki

পেছনে চিক চিক করছিলো ঝিলের জল, অন্তত দুশ’ মিটার সামনে ছিলো খোলা আকাশের আয়োজন। মঞ্চ নেই, নেই কোনো আড়ম্বর। ছিলো প্রকৃতি, গাছ-ঘাস-শিল্পী ওয়েছের নান্দনিক ছোঁয়ায় খোলা মাঠ ভেসেছে যেন সূর্য আর শাপলার জলজলে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে। ঘুড়ি উড়িয়েছেন মানুষ, গান হয়েছে, খেলেছেন এমনকি বড়রা- মহিলা আর পুরুষেরা। ঢালু আর সমতলে শিশুদের কলকল ধ্বনিতে এই আনন্দ আয়োজন রূপ নিয়েছিলো বৈশাখী মেলায়। প্লাটফিল্ড পার্কের এ আয়োজন ছিলো সীমাবদ্ধ। কিন্তু এ আয়োজন যেন সীমা অতিক্রম করেছে। শত শত মানুষের উপস্থিতি প্রাণিত করেছে উদ্যোক্তাদের। ঘোষণা করা হয়েছে-  আগামী বছর থেকে প্রতিবছর এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বিশাল পার্কে আয়োজন করা হবে বৈশাখী মেলার।

৩.
আপাতদৃষ্টিতে বাঙালি ধারার বিপরীত এক সমাজ সংস্কৃতির সাথে বেড়ে উঠছে আমাদের এ প্রজন্ম। এ এক কঠিন যাত্রা চলছে শিকড় সন্ধানী মানুষগুলোর। বন্ধুর পথ চলা, তবুও এই ব্রিটেনে আগামীর কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের জন্য অন্তত একটা সেতুবন্ধন তৈরিতে কাজ করছে বাঙালিদের এই মেলাগুলো। একটা দিনের জন্য হলেও মেলাগুলোর আবেদন বাড়ছে। লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে মেলা, মেলা হয়েছে সাউথ হল, রেডব্রিজ, ইলফোর্ডে। হয়েছে লুটন, বার্মিংহাম, কার্ডিফ, লিভারপুলসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গার কোনো হল কিংবা অডিটরিয়ামকে কেন্দ্র করে। সবখানেই উপস্থিতি চেখে পড়ার মতো। বিপরীত স্রোতে হলেও আমরা আশাবাদী, বহুসংস্কৃতির এই সভ্যতায় আমরা আমাদের আবহমান ঐতিহ্য নিয়েই পা রাখতে পারবো আগামীর দিনগুলোতেও।

Check Also

সমালোচনা সাহিত্যের কতক কেজো প্রসঙ্গ

অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের সাহিত্যে কথাসাহিত্য-কবিতা যতটা পরিণত (mature), সমালোচনা সাহিত্য ঠিক ততটাই অপরিণত (immature)। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *