Saturday , September 23 2017
শিরোনাম
হোম / শিল্প ও সাহিত্য / বারুদ পোড়া সন্ধ্যা

বারুদ পোড়া সন্ধ্যা

মিঠুন কুমার পাল
sahitto_114623

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গৌরবময় ঘটনা। নানাভাবে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করি। অনুষ্ঠান সভা, সেমিনার, লেখা-লেখির মাধ্যমে এই মহান ঘটনার প্রতিনিয়ত স্মৃতিচারণা চলে। এত মৃত্যু, এত কান্না, এত হাহাকার আমরা কেবল একাত্তর সালে কান পাতলেই শুনতে পাই। এই অবারিত রক্তধারা, রক্তের রক্তিম স্রোত আজো কিছু লেখা-লেখিতে স্পষ্ট রূপে ধরা দেয়। মোস্তফা কামালের “বারুদ পোড়া সন্ধ্যা” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। বলা চলে কাহিনী বা ঘটনার সাবলিলতা ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে মহিমান্বিত করেছে। ব্যক্তির অন্তরদহনের একটি বাস্তব ঘটনা।

মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলেও মুক্তিযুদ্ধকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পরিবর্তিত। এত মৃত্যু কেবল দুদিনে ভোলার নয়। মনের ক্ষত এত সহজে শুকায় না। “বারুদ পোড়া সন্ধ্যা” সেই ক্ষত না শুকানোর গল্প। যা বর্তমান সময়ে পড়েও আমরা চলে যেতে পারি একাত্তরে। মোস্তফা কামালের “বারুদ পোড়া সন্ধ্যা” মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের ঘটনাই বেশি স্থান পেয়েছে। কিন্তু লেখক ফ্ল্যাশব্যকে পাঠককে নিয়ে যান একাত্তরের নির্মম ও করুণ কাহিনীর আবর্তনের ভেতরে।

উপন্যাসটির কাহিনী খুব বেশি জটিল নয়। লেখকের কথা বলার সাবলীলতা উপন্যাসটিকে একটি নতুন রূপ দিয়েছে। উপন্যাসটির কেন্দ্রিয় চরিত্র হুমায়ূন কবির একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আগাগোরা একজন আদর্শবান মানুষ। কখনো আদর্শের কাছে মাথা নত করেন না। সারা জীবন সৎ জীবন-যাপন করেছেন একাত্তরের স্মৃতি তার কাছে দগদগে ঘাঁ এর মত। যা সহজে শুকায় না। খুব জ্বালা পোড়া দেয় সব সময়। একটি টেলিফোন তাকে বিচলিত করে দিয়েছে। তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মা হারা একমাত্র ছেলে “আকমল”কে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে নাকি খুনের মামলা আছে। কিন্তু হুমায়ূন সাহেব এটা মানতে পারছে না।অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই আকমল ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে সে। অথচ সেই ছেলের নামে এমন কথা শুনে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

ঔপন্যাসিক আমাদের প্রথমেই পরিচয় করিয়েছেন হুমায়ূন কবির সাহেবের সাহসী কতার সাথে। একাত্তর সালে তারা চার ভাই সবাই যুদ্ধ করেছে দেশের জন্য। অনুমতিটা বা নির্দেশটা তারা তাদের বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তিনি তার তিন ভাই ও মা বাবাকে হারান। একাত্তরের বর্বরতা তাকে এত ঘনিষ্টভাবে আলিঙ্গন করেছিলো যে, সারা জীবনেও তিনি তা ভুলতে পারেন নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে তিনি বুকে আগলে ধরে বাঁচতে চান। সন্তানের গ্রেফতারের খবরটি তাই-ই হয়তো তাকে বিচলিত করেছে।

হুমায়ূন কবির আগাগোড়াই একা মানুষ। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আকমলকে কখনোই সৎ মায়ের কাছে সৎ মা সুলভ আচরণ করতে দেয়নি। এখানেও তিনি বিজিত একজন মানুষ। দ্বিতীয় স্ত্রী মুরুফার কোন সন্তান না থাকাতে তিনিও আকমলকে মাতৃস্নেহে বড় করেছেন। কিন্তু আজ তার বিপদের দিনে তার দ্বিতীয় স্ত্রীও কাছে নেই। তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে খবর পাঠালেন দ্বিতীয় স্ত্রী মারুফাকে। মারুফা এসে সমস্যার সমাধান করবেন এটা তার আশা।

উপন্যাসটিকে রাজনৈতিক উপন্যাস বললেও অযাচিত হবে না। কারণ উপন্যাসটির পরতে পরতে রাজনৈতিক আবহ ঘনায়িত। হুমায়ূন কবির সমাজের একজন প্রগতিশীল ও সচেতন লেখক। তার লেখা-লেখির অভ্যাস। তৎকালিন রাজনৈতিক পেশি শক্তি শিকার সে। যার কারনে প্রগতি ধারার লেখক হয়েও তার ছেলেকে জেলে যেতে হয়। তার ছেলের মুক্তির কোন উপায় বের করতে পারে না। শুরু হয় তার ছোটাছুটি। আকমলের মামা “মনজুর আহমেদ” পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। কিন্তু আকমলের মুক্তিতে তারও কোন হাত নেই বলে অধ্যাপক হুমায়ূন কবির বিচলিত। যে দেশের জন্য তিনি এত কষ্ট করেছেন, পরিবারকে হারিয়েছেন, সেই দেশে কিনা তিনি বিচারহীনতায় ভুগছে! তার কষ্ট হয়। মামা মনসুর আহমেদও ভাবে-

“আকমলের অতীত রেকর্ড ভীষন পরিষ্কার। ওর কোন কালো স্পট নেই। হঠাৎ করে ও কিছু একটা করে বসবে তা তিনি মনে করেন না।”

মূলত রাজনৈতিক নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন হুমায়ূন কবির। তাদের জনবিচ্ছিন্ন কার্যাবলী মানুষকে অতিষ্ট করে তুলেছে। তিনি কলামিষ্ট। এটাই হয়তো ছিলো তার অপরাধ। ঔপন্যাসিক বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এভাবে-

“মৌলবাদীদের উত্থানের জন্য তিনি জোট সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে তুলোধুনো করেছেন।”

“বারুদ পোড়া সন্ধ্যা” উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা হলেও মূলত একটি বিশেষ সময় পর্বের মানুষের আতœদহনের চিত্র চিত্রিত হয়েছে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলো চার দলীয় সরকার। আর হুমায়ূন কবির প্রগতি ধারার লেখনীতে সেই সরকারের মন্ত্রী এমপিদের মুখোশ উšে§াচন করেছে। মৌলবাদ উপমহাদের একটি বিশেষ প্রত্যয়। অনেকে এটা  নিয়ে কথা বলে জীবনও দিয়েছেন। লেখক ও তাই বলেছেন-

“মৌলবাদীদের সমালোচনা করা যাবে না। তাদের প্রশংসা করে লিখতে হবে।”

‘বাংলাভাই’ নামে যে মানুষটি মানুষের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করেছিলেন তার প্রসঙ্গ ও এসেছে উপন্যাসটিতে। বাংলা ভাইয়ের ন্যাক্কার জনকর কার্যাবলীয় বিবরণ লেখক অত্যন্ত চমৎকারভাবে দিয়েছেন।

“বাংলাভাইয়ের ক্যাডার বাহিনী এলাকায় কোন মুক্তিযোদ্ধ অথবা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতাকে ধরে এনে উঁচু গাছের ডালের সাথে রশি দিয়ে উল্টো করে বাঁধে। শুরু হয় নিপীড়ন নির্যাতন।”

হুমাযূন কবির এবং তার শ্যালক মিলে চেষ্টা করেছেন যাতে আকমলকে ছাড়িয়ে আনা যায়। পুলিশি রিমান্ড খুব ভয়াবহ! একথা চিন্তা করে হুমায়ূন সাহেবের কলিজা শুকিয়ে যায়। ফলে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে তার ভেতর এক ধরনের কাতরতা দেখা দেয়।

উপন্যাসে রাজনৈতিক আবর্তের ভেতরে একটি প্রেমের অপরিণত রূপ আছে। আকমল পুলিশি হেফাজতে মারা যাওয়ায় মনজুর সাহেবের মেয়ে শিপ্রা ও আকমলের প্রেম পরিণতি পায় নি। অথচ দুজন দুজনকে কত প্রগাঢ়ভাবে ভালবেসেছিলো। মা-বাবা মেনে না নিলেও শিপ্রা যে আকমলকেই বিয়ে করবে সে তা ভেবে রেখেছিলো। কিন্তু আকমলের পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন ও অত্যাচার শিপ্রাকে ভাবিয়ে তোলে। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জীবনের কাছে পরাজিত হয়। এটাই উপন্যাসের বড় অমানবিক দিক। রাজনৈতিক দাবানল কেন মানুষের জীবন থেকে প্রেম, ভালোবাসা, আবেগকে কেড়ে নেয়? শিপ্রার মৃত্যু আমাদেরকে যেন সে কথাই জানান দেয়।

আকমলের মুক্তির কোন উপায় নেই। তাকে যে মরতেই হবে। কারণ সে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি দেশের কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রন করছে। তাদের কাজে কর্মে যেন তারই বহি:প্রকাশ। শরিফুল আজমের কথায় তারই পরিচয় পাই-

“মুক্তিযোদ্ধা না চুক্তিযোদ্ধা ওদের খবর কী?

ঐ শালারা এখন না খেয়ে মরেেছ। ওদের যাওয়ার জায়গা আছে নাকি? এখন আমরাই হইলাম দেশের মা-বাপ। যা বলবো তাই হবে।”

শেষোক্ত কথাটির মধ্যে আমি আকমলের জীনের করুন পরিনতির ছবি দেখতে পাই। এটাই হয়তো উপন্যাসের পরিণতি। অর্থাৎ প্রগতিশীলদের ক্ষমতাবানদের হাতে মরতে হবে, এটাই যেন অনিবার্য সত্য। পুলিশি হেফাজতে আকমলের মৃত্যু উপন্যাসটিকে বিয়োগাতœক করে তুলেছে। ক্ষমতাবানদের হাতে ক্ষতাহীনের মৃত্যু। এই করুন পরিণতি মেনে নিতে হুমায়ূন কবিরের কষ্ট হয়। জীবনে তিনি যেমন কখনো আদর্শকে ত্যাগ করেন নি তেমনি আদর্শহীনতায় বেঁচে থাকায়ও তার অনীহা। কিন্তু উপন্যাসের শেষে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা আছে। আর তা হলো ‘প্রতিবাদ’। বাঙ্গালি কোন কালে কোন অন্যায়কে মেনে নেয় নি। যেখানেই অন্যায় অবিচার বাঙ্গালি প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। নিজেদের অধিকারকে আদায় করে নিয়েছে। এটা এই উপন্যাসের একটি আশান্বিত দিক। হুমায়ুণ কবির লক্ষ করেন তার ছেলের মৃত্যুতে দেশের মানুষ বসে নেই। তিনি আজ একা নন। দেশের কোটি কোটি জনতা আজ তার পাশে। তাকে আটকে রাখা যাবে না। জনতা আজ বিচার চায়। যখন জনতা বলে-

“পুলিশ হেফাজতে নিরাপরাধ আকমল কবিরের অকাল মৃত্যুর প্রতিবাদে আজ আমরা মাঠে নেমেছি। দু:শাসন দূর না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না।”

হুমায়ূন কবির বুঝতে পারে যে “তোমার ছেলে ফিরলো মাগো হাজার ছেলে হয়ে।” দেশের দু:শাসন প্রতিরোধে তার ছেলে আকমল আমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের মনের ভিতর আমরা যে স্বাধীনতায় চেতনাকে উপলব্ধি করি আকমল তা জাগ্রত করেছে। লেখক এখানে বলেছেন-

“নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সে দেশকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। তার মৃত্যু স্ফুলিঙ্গের মতো দু:শাসনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেবে।”

প্রতিবাদী চেতনায় ঔপন্যাসিক বাঙ্গালির মনের অন্তরতলের সাহসকে উন্মোচিত করেছেন। আমরা সাহসী জাতি। উপন্যাসটি পাঠের মাধ্যমে যেন সে কথাই মনে হয়। তাই বলা যায় মোস্তফা কামালের “ “বারুদ পোড়া সন্ধ্যা” আমাদের ক্রান্তিকালের একটি ধূসর ছবি। যার মাধ্যমে আমরা প্রতিবাদী এক বাংলাদেশকে দেখি।

Check Also

সমালোচনা সাহিত্যের কতক কেজো প্রসঙ্গ

অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের সাহিত্যে কথাসাহিত্য-কবিতা যতটা পরিণত (mature), সমালোচনা সাহিত্য ঠিক ততটাই অপরিণত (immature)। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *