Sunday , September 24 2017
হোম / ফিচার / হারিয়ে যাচ্ছে কারিগর পাখি বাবুই

হারিয়ে যাচ্ছে কারিগর পাখি বাবুই

মো. পারভেজ আবেদীন

1

বসবাস উপযোগী পরিবেশ বিঘিœত হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈল্পিক বাসার কারিগর শিল্পী বাবুই পাখি। আগ্রাসী যান্ত্রিকতা তার শিল্প অহঙ্কার তছনছ করে দিয়েছে। তাকেও চড়াইয়ের মতো আবদ্ধ করেছে অট্টালিকার পরে। তাই হয়তো এখন আর গ্রামের মেঠোপথের ধারে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছটির সামনে তার সুরেলা কণ্ঠের কিচিরমিচির ডাক শোনা যায় না। দেখা মেলে না শৈল্পিক বাসায় সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রণয়ের দৃশ্যও। তবে ঢাকার সাভার উপজেলার গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে নলাম ব্রীজ এলাকায় একটি তালগাছে এদের শতাধিক দৃষ্টিনন্দন বাসা রয়েছে। যা দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসী প্রতিদিনই এ এলাকায় ভিড় জমান।
কয়েক দিনের টানা প্রখর রোদের উজ্জ্বলতায় রাঙা প্রকৃতির মতো এরাও মেতে ওঠে প্রাণোচ্ছল উচ্ছ¡াসে। মাত্র এক যুগ আগেও সর্বত্র চোখে পড়তো বাবুই পাখি। এখন আর সারিবদ্ধ তালগাছের পাতায় ঝুলতে দেখা যায় না তাদের শৈল্পিক বাসা। কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় না গ্রামবাংলার জনপদ। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ব্য, অপিরকল্পিত নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে এ পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের আগ্রাসী কার্যকলাপের বিরূপ প্রভাবেই ওরা হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে দেশের কয়েকটি জায়গায় এখনো হঠাৎ করেই চোখে পড়ে বাবুই পাখির বাসা। নতুন বাসা তৈরির জন্য অতীতের যাবতীয় দুঃখ ঘুচিয়ে আনন্দে উদ্বেলিত মনে তারাও পাখা মেলে নীল দিগন্তে। সাধারণত নলখাগড়া ও হোগলা পাতা দিয়ে বাবুই পাখি তার বাসা বুনে থাকে। তবে বাসা তৈরিতে খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতাপাতাও ব্যবহার করে বাবুই। উঁচু তালগাছে তৈরি চমৎকার বাসাগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি মজবুত। প্রবল ঝড়েও টিকে থাকে তাদের বাসা। বাবুই পাখি সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করতে ডোবা, নালা, পুকুরের জলে স্নান করে, এরপর উঁচু তালগাছ, নারিকেল বা সুপারি গাছে বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। বাসা তৈরির অর্ধেক কাজ শেষ হলে কাক্সিক্ষত স্ত্রী বাবুইকে ডেকে এনে বাসা দেখায়। তার পছন্দ হলেই গড়ে তোলে নতুন সম্পর্ক। স্ত্রী বাবুইর বাসা পছন্দের পর পুরুষ বাবুই মহাআনন্দে বিরামহীনভাবে বাকি কাজ শেষ করে মাত্র চারদিনে।

2

স্ত্রী বাবুই ডিম দিলেই পুরুষ বাবুই আরেক সঙ্গী খুঁজতে বের হয়। তারপর আবার বাসা বানানো, আবার ডিম দেয়া, আবার সঙ্গী খোঁজা। এভাবে এক মওসুমে পুরুষ বাবুই সর্বোচ্চ ছয়টি বাসা তৈরি করে। তবে এতে স্ত্রী বাবুইর কোনো আপত্তি নেই। স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। আর তিন সপ্তাহ পর বাবুই বাচ্চা ছেড়ে উড়ে যায়। বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। বাবুই মানুষের মানবিক ও সৌন্দর্যবোধকে জাগ্রত করার পাশাপাশি দেয় স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণা। কথিত আছে, রাতে জোনাকি পোকা ধরে এনে সে তার বাসায় রাখে। বাবুই পাখি সাধারণত বিভিন্ন ফসলের বীজ, ধান, বিভিন্ন প্রজাতির পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু ও রেণু প্রভৃতি খেয়ে জীবনধারণ করে। বাবুই পাখি দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।
এরা সাধারণত তিন প্রজাতির হয়ে থাকে, দেশি বাবুই (Ploceus philippinus), দাগি বাবুই (Ploceus manyar) এবং বাংলা বাবুই (Ploceus bengalensis)। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার প্রণালী বদলে যাওয়ায় পরিবেশগত বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ফলে পশুপাখি কীটপতঙ্গের মধ্যে নানান ধরনের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। অনেকে পারিবারিক প্রয়োজনে সুপারির গাছ লাগালেও, ইচ্ছা করে তালগাছ লাগায় না। কারণ এই গাছের ফল অনেক দেরিতে ধরে। এসব কারণে লম্বা গাছের অভাবে বাবুই পাখিসহ অনেক পাখি আজ বিলুপ্তির পথে।

Check Also

পাহাড়ে এক সন্ধ্যায় বন মোরগের পেছনে

অনলাইন ডেস্ক : পরিচিত বসতি বমপাড়া। গাছে গাছে ঝুলে নেই কাঁঠাল, আম, লিচু আর তেঁতুল। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *