Saturday , November 25 2017
শিরোনাম
হোম / শিরোনাম / দমন হলেও বিনাশ হয়নি জেএমবি

দমন হলেও বিনাশ হয়নি জেএমবি

অনলাইন ডেস্ক :১৯ বছর আগে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েমের নামে কট্টরপন্থী ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল জামা’তুল মোজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। কিন্তু, যে সংগঠনের মূলে উগ্রবাদ, তার সন্ত্রাসবাদী চেহারা দ্রুতই ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে সারাদেশের মানুষকে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই সন্ত্রাসী সংগঠনটিকে উপড়ে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সদস্যদের চিহ্নিত করা মাত্র গ্রেফতার করা হচ্ছে কিন্তু, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীই স্বীকার করছে দমন করা হচ্ছে বটে কিন্তু বিনাশ হয়নি জেএমবি।

জেএমবির প্রকৃত চেহারা দেশবাসী দেখতে পায় আজ থেকে ১২ বছর আগে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট এইদিনে। সেদিন দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয় নিষিদ্ধ এই জঙ্গি সংগঠনটি। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে সারাদেশের ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচশ’ স্থানে বোমা হামলা চালিয়েছিল তারা।

জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট’-এর প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পুরোপুরি ধ্বংস করতে না পারলেও জেএমবি’র নেটওয়ার্ক ও সাংগঠনিক কাঠামো বিধ্বস্ত করে দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও বড় ধরনের হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা এখন আর তাদের নেই। তারপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক থাকার কোনও বিকল্প নেই।’

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযান, জেএমবি’র নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে জঙ্গি সংগঠনটি বর্তমানে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই খণ্ড-বিখণ্ড অংশগুলো বিভিন্ন সময় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। সাংগঠনিকভাবে তারা সংঘবদ্ধ হতে না পারলেও নাশকতার ছক আঁকছে সবসময়ই। সর্বশেষ মঙ্গলবার পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী জঙ্গি সাইফুল ইসলামের ঘটনাটি সে রকমই। জাতীয় শোক দিবসের দিনে ৩২ নম্বরে জঙ্গি সাইফুল যদি সঙ্গে থাকা শক্তিশালী তিনটি বোমার বিস্ফোরণে সফল হতো, তাহলে কত লোক মারা যেত, তা মনে করলেই গা শিউরে ওঠে।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জঙ্গি সাইফুল ইসলামের কাছে যে তিনটি বোমা ছিল, তা যদি ৩২ নম্বরে গণজমায়েতে ব্যবহার করা যেতো, তাহলে ঘটনাস্থলেই ১৫ থেকে ২০ জন মারা যেতেন। আহত হতো শতাধিক ব্যক্তি।’

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় প্রায় পাঁচশ’ স্থানে জেএমবি একযোগে বোমা হামলা করে। এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল মূলত তাদের অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক ক্ষমতার জানান দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাতে তারা সফল হয়েছিল বলা যায়। তবে আল কায়েদার অনুসরণে জেএমবি’র যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে। ১৭ আগস্ট হামলার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই বছরই জুলাই মাসে ব্রিটেনে একাধিক জায়গায় জঙ্গি হামলা হয়েছিল। সেই হামলার ঘটনা থেকেও এক ধরনের অনুপ্রেরণা পেয়েছিল বলে মনে হয়। তাদের ক্ষমতা যে আরও বেশি সেটা দেখানোর জন্যই পরের মাসে আগস্টের ১৭ তারিখে তারা ৬৩ জেলায় হামলা করে। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইসহ শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির মাধ্যমে জেএমবি’র প্রথম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, দ্বিতীয় অধ্যায়ে জেএমবি কাজ শুরুর পর্যায়ে আমির মাওলানা সাইদুর রহমানকে গ্রেফতারের মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টাকেও আমরা ভণ্ডুল করে দিয়েছি। তারপর তারা বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে। পরবর্তী সময়ে যারা আমির হয়েছে, দায়িত্ব পেয়েছে, তাদের বেশিরভাগকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মাওলানা সাইদুর রহমানের ছেলে কিংবা পরবর্তী সময়ে তাসনিমদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের তৎপরতার কারণে তাদের সেসব চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তারা যে অপ-আদর্শকে কেন্দ্র করে এই জঙ্গি দল গঠন করেছিল সেই অপ-আদর্শিক কারণটাকে এখন পর্যন্ত নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

জঙ্গি বিষয়ে অভিজ্ঞ এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, জেএমবি বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ নব্য জেএমবি নামে পরিচিত। আরেকভাগ সেই পুরানো জেএমবি। পুরানো জেএমবি’র নেতৃত্ব দিচ্ছে সালাহ উদ্দিন সালেহীন। ত্রিশালে প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর থেকে সে পালিয়ে ভারতে চলে যায়। আমাদের জানামতে এখনও সেখানেই সে অবস্থান করছে। পুরনো জেএমবি’র তৎপরতা এ দেশে সেভাবে সক্রিয় নেই বাংলাদেশে।

গত বছরের ৩০ জুন গণমাধ্যমে পাঠানো পুরানো জেএমবি’র এক বার্তায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর বাড্ডায় প্রকৌশলী খিজির খান হত্যাকান্ড পর্যন্ত তারা দায় স্বীকার করে। কিন্তু গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার দায় তারা স্বীকার করেনি। এ বিষয়ে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশান হামলা নব্য জেএমবি’র কাজ। তিনি বলেন, নব্য জেএমবি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা ও আইএসএর কার্যক্রমকে অনুসরণ করে থাকে। ওই হিসেবে তারা বিদেশি ও নন মুসলিম, এমনকি মুসলমানদের ভেতরেও যারা তাদের ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করে না তাদের ওপর হামলা করেছে। এরাই হলি আর্টিজানের ঘটনা ঘটিয়েছে। শোলাকিয়াতেও ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছে তারা। নব্য জেএমবি’র সাংগঠনিক যে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল সেটাকেই একেবারেই বিধ্বস্ত করে ফেলেছি আমরা। এদের সাংগঠনিক কাঠামো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। কোনও কোনও খণ্ড এখনও হয়তো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। তবে বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা এখন আর এই নব্য জেএমবি’রও নেই।

তিনি বলেন, জঙ্গিবাদকে বিনাশ করতে হলে তারা যে আদর্শে মোটিভেটেড হয়েছে সেই জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। সেই কাজটা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, মাতা-পিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তাহলেই জঙ্গিবাদ বিনাশ হবে এদেশে।

Check Also

বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার সুপারিশ ইউজিসির

অনলাইন ডেস্ক : দেশে দক্ষ ফ্যাকাল্টি তৈরির উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্বমানের একটি গবেষণা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *