Thursday , October 19 2017
হোম / শিল্প ও সাহিত্য / প্রাকৃত আবেগের শিল্পায়ন

প্রাকৃত আবেগের শিল্পায়ন

ঢাকার ডাক ডেস্ক :  সোহেল প্রাণনের শিল্পাঙ্গন আর্ট গ্যালারিতে গেল বছরের এপ্রিল মাসে তৃতীয় একক চিত্র প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে একটি স্যুভেনির বের হয়। তাতে খ্যাতিমনা শিল্পসমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ একটি নিবন্ধ লেখেন। যেখানে সোহেলের চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দৃকপতা করা হয়েছে। লেখাটির গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে পত্রস্থ করা হলো। লেখাটি পাঠে সোহলের চিত্রদর্শন সম্পর্কে সম্মক ধারণা পাওয়া যাবে। বি.স]

এখানে জীবন মানে শ্যামলী-পরিধির মাঝে দাঁড়িয়ে নিসর্গ-যাপন। কুল কুল জল, নিতল শীতল জল,স্বচ্ছ জল,আঁধার-মগ্ন জল; বস্তুত আকাশ,বৃক্ষ,লতা-গুল্ম,পাতা-পতঙ্গ আর বিচিত্র প্রাণের ঘ্রাণের কুহক আমাদের জীবনের মানে বিশদ ভাষায় বুঝিয়ে দেয়। একনিষ্ঠ শ্রমী চাষাও এখানে জীবনের মানে অন্বেষণ করে। দেহ ঘাম ঝরে, তবুও বাউল বা মারফতির সুরে রহস্যলোক উন্মোচন করে। দাওয়ায় ধান ভানে যে নারী সে-ও আলাপে-বিলাপে অনন্তকে স্পর্শ করতে চায়; জীবনের অর্থ তালাশ করে। প্রাণীর বুনো ঘ্রাণ, আদিম-অরণ্যের পুরাতাত্ত্বিক অভিব্যক্তি, ঋতুর-আবর্তে ফুল-ফসলের ঘ্রাণের নবায়নে বার-বার আমরা বিমুগ্ধতার বেষ্টনে আত্মসমর্পণ করি। এই স্বপ্নলোক বা আর্কেডিয়ার মধ্যে নিজেকে অনুভব করতে চেয়েছেন তরুণ চিত্রকর সোহেল প্রাণন। সৃজনের আয়োজনে আমরা পঞ্চেন্দ্রিয় জাগর করে আরাধনাশীল হয়ে পড়ে; হৃদ সাগরে মহ-মান হই। চাক্ষুষ উপরিতল তখন ইশারা মাত্র। মন তখন ডুবুরি-বস্তুর অতলান্তিকতার রহস্য ভেদ করতে চায়। কোনো শিল্পই একা একজন মানুষ সৃষ্টি করে না। তার রক্তবীজে জন্ম-জন্মান্তরের বহু হৃদয়ের বার্তা থাকে। তাই কোনো শিল্পই পরম্পরা বিছিন্ন নয়। এই বাংলার অনাদি নিসর্গের মায়াপথে হেঁটে আরও অনেক যুগের শিল্পীর মত শিল্পসৃজনে মনোনিবেশ করেছেন প্রাণন। তার চিত্রকলার বিষয় বাংলার প্রকৃতি, মানুষের মুখ, জনবীবনের কর্মিষ্ঠ ও অলসায়িত রূপ।

নদী,খাল, বাড়ির আঙ্গিনা, প্রাঙ্গণ, মাঠ, প্রাণনের পর্যবেক্ষণের বিশেষ দিক। প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক যোগাযোরেগ সাক্ষী এসব ছবি। আজন্মের সম্পর্কের কারণে প্রকৃতির থেকে সৃষ্টির যে প্রণোদনা আসে তার একটা বিশেষ রূপ আছে। এই রূপে শিল্পায়িত সুন্দরের অন্তরালে শিল্পীর মরমী ভাবনা যুক্ত থাকে। প্রকৃতি আমাদের অপার রহস্যের পথে টেনে নিয়ে যায়। একটা অতীন্দ্রিয় আবেশের ছাপ আছে প্রাণনের ছবিতে। আশৈশব সৌন্দর্যমুগ্ধতার কারণে ওই রহস্যের স্তর স্পর্শ করতে পেরেছে এই তরুণ। নিত্য বিকশিত ও রূপান্তরিত প্রকৃতিকে তারাই নিবিড়ভাবে পাঠ করতে পারে যারা ওই প্রকৃতির কাছে আগন্তুক নয়-যারা শিল্পের অনুশীলনের জন্য নিয়ম বেঁধে নিসর্গ দর্শনে আসে না। প্রাণন গ্রামলগ্ন যশোর শহর ও বৃহত্তর খুলনার প্রকৃতি ও প্রকৃতিনিষ্ঠ মানুষের ও প্রাণীকুলের স্বভাব শৈশব থেকে শুরু করে আজও পাঠ করে চলেছেন। নাড়ীর টানে আঁতুড় আবাসে তিনি বার বার ফিরে আসতেই চান না শুধু, বরং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের ভাবনা তার মনে কাজ করে। যশোরের গ্রামই তার শান্তির নিরালা নীড়। ওখানে আবাসিত হওয়াই তার স্বপ্ন। এখানেই আমাদের গ্রামদৃশ্যপ্রধান রিয়ালিজমের সঙ্গে পশ্চিমের রিয়ালিজমের পার্থক্য। দু’পক্ষই সত্যনিষ্ঠ থাকতে চায়। প্রকৃতির যে অভিব্যক্তি আমাদের চোখের কাছে পরিচিত তা-ই আঁকেন। তবে পশ্চিমের রিয়ালিজমের থাকে জ্যামিতির জোরে বিশেষ প্রত্যক্ষতা আর পূর্বদেশের গ্রামলগ্ন শিল্পীরা সেই জ্যামিতি ছাপিয়ে অনির্বচনীয় মনোবেগ উজিয়ে প্রকাশ করেন।

তার প্রাণনের ছবিতে যে বিধুরতা আছে, আছে আলো-আঁধারির বুনট তার কারণ গ্রামে বসবাসের স্মৃতির সংক্রমণ। তিনি একদা যা দেখেছেন তার রূপ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই বদলে-যাওয়া প্রাণনের স্মৃতিকাতর মন মেনে নিতে চায় না। তিনি সেই দূরের সরলা জীবন প্রত্যাশা করেন। নাঈভ বা সরলা স্বভাবকে লালন করেই গ্রামের মানুষের একজন হয়ে পল্লিবাংলাকে রূপায়িত করেছেন শিল্পী। সরল মনের ভাবনা যে তার নিসর্গ-দৃশ্যই শুধু পরিদৃশ্যমান তা নয়, তার মানুষী অভিব্যক্তিগুলোর মুখেও ওই রূপ চোখে পড়ে। তিনি আমাদের দেখাতে চান মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীর পারস্পারিক সম্পর্কের যাদু। আসলে এই সম্পর্ক সূত্রটাই জীয়ন কাঠি-জীবনকে সদর্থক সুখের দোলায় বাঁচিয়ে রাখে। তাই মানুষ ও পশুর মিতালি, পক্ষিযুগল ইত্যাদি এঁকে সেই মায়া-ডোর প্রতিপন্ন করেছেন প্রাণন। কখনও প্রকৃতি ও মানুষী রূপ অভিন্ন সত্তায় উত্তীর্ণ। ঘননীলের আবেশে বিজাড়িত প্রকৃতির মধ্যে বসে থাকা ছবিটিতে যে নারী আছে সে যেন নিজেই প্রকৃতি-মাতা। এখানে প্রকৃতিকে অনাদি টোটেম বিশ্বাসীদের মত পূজনীয় মনে করেছেন শিল্পী।

মায়া ও স্মৃতির টানেই প্রাণন একটা পরিত্যক্ত রেল স্টেশন বা পতিত বাড়ি শিল্পায়িত করার জন্য আকর্ষণ বোধ করেন। কখনো টলটলে জলের প্রতি, কখনো বা ভাঙ্গন-জর্জর কোনো কাঠামোর দিকে মনোনিবেশ করে আবেগ খলবলিয়ে প্রকাশ করেছেন প্রাণন। দুঃখবোধ ও জীবনের অসুখি রূপ আঁকার প্রতি তার আকর্ষণ নেই বললে চলে। নাঈভ বা সরলা স্বভাবের শিল্পীমনের কাছে পৃথিবীর মহামানবেরা বিশেষ অভিব্যক্তি পেয়ে থাকে। প্রাণনের মধ্যেও কাজ করেছে সেই বোধ। প্রকৃতি যেমন তার মনোমুকুর, সৃজন পথের মহাজনরাও তার কাছে দর্শন বিশেষ। তাদের মুখে সৃজনধর্মের সূত্রে যে অভিব্যক্তি আছে তা নিরীক্ষণ করেছেন প্রাণন। মাইকেল মধুসূদন, সুলতান, ফ্রিদা কালো, চে গেভারা, লুই আই কান, ভ্যানগঘ, উত্তম, সুচিত্রা, ববিতা প্রমুখ মানুষের চোখ ও মুখের ভঙ্গি পাঠ করেছেন শিল্পী। এই মানুষেরাও আইকন বা প্রতিমা। এঁরা আধুনিক মানুষের পূজনীয় দেবতা। এই মহাজনরা প্রাণনের অন্তরে বিরাজ করেন। কখনো সামান্য রেখার টানে, কখনো আবার অবিশ্রাম রেখার প্রয়োগে এই আধুনিক দেবোপম মহামানবদের চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নিরুপণ করেছেন তিনি। পূজারীর মন পূজনীয়র সঙ্গে অভিনাত্মা অনুভব করে। এটা অবশ্য আত্মরূপমুগ্ধতারই নামান্তর। প্রাণনের চে-র টুপি পরে বাউলের মত লম্বা চুল রেখে আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন। মানবদরদি আদর্শে যে শিল্পী উদ্বুদ্ধ থাকতে চান তারই প্রমাণ তার আত্মপ্রতিকৃতি।

স্বভাবকবির মত স্বভাব শিল্পীর বৈশিষ্ট্যে পরিকীর্ণ প্রাণনের কাজ। শিল্পে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেও একাডেমী বা কোনো গুরুর ধারার অনুবর্তী হতে চাননি এই তরুণ। নিজের অমল আবেগ উজিয়ে প্রকাশ করে স্বাতন্ত্র্য সন্ধান করেছেন শিল্পী । তবে আবেগের বিচরণ সুগম করার জন্য পটচিত্রের ললিত রেখায় তিনি নির্ভরতা খুঁজেছেন। তা ছাড়া কৌতুক রসের পরিবেশনে কোনো কোনো ইমেজ অদ্ভুতদর্শন হয়ে উঠেছে। ফ্যান্টাসির প্রতি আকর্ষণও তার সরল আবেগী মনেরই স্মারক। প্রাণন এভাবে শিল্পের নানা মাত্রা অনুভব করতে চেয়েছেন।

Check Also

সাদা ফুল

সাদা ফুল সোনিয়া স্নিগ্ধা পাথরের চোখে দোলেনা শান্তির সাদা ফুল ভুল হয়ে ঝুলে রয় খোপায়। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *