Friday , September 22 2017
হোম / শিল্প ও সাহিত্য / আমার সুনীল

আমার সুনীল

ঢাকার ডাক ডেস্ক : আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালির মতো আমারও কাকাবাবু দিয়েই শুরু; প্রথম রহস্যটার নামও দিব্যি মনে আছে ‘ভূপাল রহস্য’। সাবলীল ভাষা, কিশোর মনের সাথে অনায়াসে মিশে যাবার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা নাওয়া খাওয়া ভুলিয়ে দিতে পারে। পরে সুনীলের গদ্য কিংবা কবিতা পড়েও দেখলাম ভাষার কাঠিন্য নেই, অকারণ লেখাকে দুর্বোধ্য করার ঝোঁক নেই, সরল লেখাও কতখানি গভীর করে তোলে! ভিলেনকে কী অনায়াসে মাফ করে দেবার ক্ষমতা রাখেন কাকাবাবু! কিংবা কঠিন কোনো রহস্যভেদের পর যখন নদীর তীরে বসে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চান, তখনই সুনীল মাতিয়ে দিয়ে যান আমাকে। বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ব্র্যাভো’। কাকাবাবুর হাত ধরে পাচমারির জঙ্গল, আফগানিস্তান, মিশর, ত্রিপুরা, নেপাল, আন্দামান ঘুরে আসি অনায়াসে। কাকাবাবু যখন ধমক দেন আন্দামান সমুদ্র তীরে কচ্ছপের ডিম না খাওয়ার জন্য। বড় হয়ে বুঝেছি কিভাবে কিশোর মনে প্রকৃতি প্রেমের বীজ বপন করে দিয়েছেন সুনীল।

নীরা পড়ি একটু বেশি বয়সে। তখন প্রেম শুরু করেছি। প্রেমিকাকে চিঠি পাঠাব? কোনো সমস্যা নেই, চিঠির আধ পাতা জুড়ে নীরার কোট দিলেই জ্যাকপট হিট যে! এর চেয়ে আর বেশি রোম্যান্টিক কী হতে পারে।

‘নীরার অসুখ হলে কলকাতার সবাই দুঃখে থাকে/ সূর্য নিবে গেলে পর, নিয়নের বাতিগুলি হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়/নীরা আজ ভাল আছে?’
এই নীরাকে নিয়ে আকুলতাটা কবিতার এক অবিশ্বাস্য উত্তরণ ঘটায়। শুধু নীরাই বলব কেনো, সুনীলের সহজ সরল গভীর কবিতা আমার যৌবন জুড়ে আছে। অকারণ কবিতা দিয়ে লেখা ভারাক্রান্ত করব না, তাতে লেখার শব্দ সংখ্যা বাড়ে হয়ত কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। তবে কবিতাকে বাদ দিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কখনই পূর্ণতা পান না। কবিতাই সুনীলের নীরা। আসলে সুনীল যেন বাঙালির মনের কথাটাকেই বলেছেন নীরাকে। একজন যুবক তাই সহজেই একাত্ম হয়ে যেতে পারে নীরার কবিতার সাথে। সুনীলের কবিতার আবেদন একদম বুলস আই হিট করেছে বাঙালির হৃদয়ে।
আর নীললোহিত তো সংসারী, কিন্তু বৈরাগ্য-প্রিয় বাঙালির অতি কাছের চরিত্র। চাকরির মোহ ত্যাগ করে, কলকাতার মোহ ত্যাগ করে শুধু চলে যেতে যায় দিকশূন্যপুরে, কলকাতা থেকে ট্রেনে করে, কোনো এক নাম না জানা স্টেশনে নেমে বাসে করে নেমে হেঁটে নদী পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে। যেখানে শুধুমাত্র মোহমুক্ত মানুষই থাকতে পারে। যেখানে মানুষে মানুষের একমাত্র আত্মীয়তার বন্ধন ভালবাসা। এ যেন আমাদের কাছে এক স্বপ্নের জায়গা। যখন অফিসে কাজের চাপ, বাড়িতে হাজার সমস্যা তখন নীললোহিতের দিকশূন্যপুর কল্পনা করি। বাঙালিকে সুনীল নিজের অজান্তেই এক অসাধারণ স্ট্রেস রিলিফের ফর্মুলা দিয়ে গেছেন।
একথা আমি অনেক জায়গাতেই বলেছি সুনীল যদি কেবল ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’ এবং ‘পূর্ব পশ্চিম’ লিখতেন তাহলে আর কিছু না লিখলেও হত। তিনটে কাল বাঙালির এভাবে বোধহয় আর কেউ লিখতে পারেননি। এবং সুবিশাল এই উপন্যাসগুলি কোনোখানেই ক্লান্তি আনে না। পড়তে পড়তে পৌঁছে যাওয়া যায় কালীপ্রসন্ন সিংহের কাছে কিংবা পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায় যুবক রবীন্দ্রনাথকে। `পূর্ব পশ্চিম’ কালজয়ী উপন্যাস। একই সাথে মুক্তিযুুদ্ধ একই সাথে নকশাল আমল যেভাবে তুলে ধরেছেন তা অকল্পনীয়। পশ্চিম বাংলার মানুষ কখনই সুনীলকে এপারের বলে দাবি করতে পারবেন না, সুনীল যতটা এ বাংলার তাঁর চাইতেও বেশি পূর্ব বাংলার। দেশভাগ হলেও সুনীল অনায়াসে আপন করে নিয়েছিলেন দুই বাংলাকে। এ তাঁর একার কৃতিত্ব। এই তিনটি উপন্যাস আমার সাতদিন লেগেছিল শেষ হতে। এবং তার পরে একমাস লেগেছিল এদের ঘোর থেকে বেরোতে। বলা বাহুল্য, সে ঘোর আমার এখনও কাটেনি।
একথা ঠিক মানুষের মৃত্যুর পরে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। অনেককেই আমি দেখেছি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর গানের সিডি কেনার জন্য হামলে পড়েছেন। কিংবা জীবনানন্দের মৃত্যুর পর কত জীবনানন্দ ভক্ত তৈরি হল! সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে সিনেমা না বানালে পথের পাঁচালী কি অতটা জনপ্রিয়তা পেত?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে কিছুটা হুজুগ উঠেছে। কিন্তু জীবিত অবস্থাতেই সুনীল এই হুজুগ দেখে যেতে পেরেছেন। অরণ্যের দিনরাত্রি, মনের মানুষ, হঠাৎ নীরার জন্যে, অপরাজিতা তুমি কিংবা সবুজ দ্বীপের রাজা চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সুনীল ছিলেন মুক্তমনা মানুষ। নীচতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি শব্দ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিধানে কোনোদিন ছিল না। শুধুমাত্র সুনীলের লেখা পড়লেই উদার হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। মেকি, লোক দেখানো ব্যাপার-স্যাপার সুনীলের সাহিত্যে পাওয়া যায় না বললেই চলে। একাধারে প্রেম করা থেকে শুরু করে বাঙালি পাঠককে শিক্ষিত করেছেন সুনীল। তাঁর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক দলগুলি যেভাবে মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি করল তা সুনীল জীবিত অবস্থায় দেখে যেতে পারলে মজা পেতেন। নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও তাঁর লেখনীর মতো স্পষ্ট বক্তা ছিলেন সুনীল। যেটা মনে করেছেন স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন। ফলস্বরূপ সরকারের অনেকেরই বিরাগভাজন হতে হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তাঁকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছে। কুৎসা রটিয়েছে। তাতে আর কারও সমস্যা হতে পারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনোদিন হয়নি। তিনি সে ধাতুতে গড়া মানুষ ছিলেন না! মৃত্যুর পরে সবাই দেখা গেল সুনীলের বিরাট ভক্ত হয়ে উঠছেন। যারা সুনীলকে গালাগাল না দিয়ে জল খেতেন না তারাই দায়িত্ব নিয়ে নিলেন সুনীলের সৎকারের। তবে কেউ এখনও হাল ছাড়েননি।
আমি লিটলম্যাগ শুরু করি কলেজ জীবনে। প্রথম প্রথম ম্যাগাজিনে যেরকম হয়, আমাদের সবার চিন্তা থাকত কিভাবে বিখ্যাত লোকের লেখা নেওয়া যায়। কিভাবে তাঁর একটা কবিতা বা গল্পের স্থান দেওয়া যায় আমাদের পাতায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত চরম উপেক্ষা জুটেছে। এক রাতে এক বন্ধুর থেকে নম্বর নিয়ে ফোন করেছিলাম। চাইতেই ফোন দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। হাসিমুখে বললেন, ‘বল’। আমার তো আনন্দে পাগল পাগল দশা। বললাম, ‘আমরা একটা লিটলম্যাগ বের করছি, নাম আদরের নৌকা।’ শুনে শব্দ করে হেসে উঠলেন। বললেন ‘ভালই তো, তোমাদের বয়সেই তো আদর ভাসবে, খুব ভাল নাম দিয়েছ।’ কী সহজে আপন করে নিয়েছিলেন সেদিন। এরকম তো হতেই পারত বিরক্ত হয়ে বলতেন পরে কর, এখন কাজ করছি, বা ফোনটা ধরতেনই না। কী দরকার ছিল আমার মতো সামান্যের ফোন ধরার। শুধু তাই না, ফোনে ফোনে ছোট একটা কবিতাও সেদিন দিয়েছিলেন তিনি।
গল্পটা না উল্লেখ করলেও হত। তবে এখনকার দিনে লিটলম্যাগের সম্পাদকেরা যেরকম উপেক্ষার পাত্র হন মাঝে মধ্যে, তাদের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চিরকাল লিটল ম্যাগাজিনকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। ছোট পত্রিকাকে কোনোদিন অবহেলা করেননি। কত সহস্র সাক্ষাৎকার যে ছোট পত্রিকাকে দিয়েছেন তার সীমা নেই।

Check Also

সমালোচনা সাহিত্যের কতক কেজো প্রসঙ্গ

অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের সাহিত্যে কথাসাহিত্য-কবিতা যতটা পরিণত (mature), সমালোচনা সাহিত্য ঠিক ততটাই অপরিণত (immature)। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *