Saturday , November 25 2017
শিরোনাম
হোম / শিল্প ও সাহিত্য / কানু আর মানু

কানু আর মানু

ঢাকার ডাক ডেস্ক :  সমরপুর রাজ্যের রাজা বুড়ো মানুষ। নাম সমরেন্দ্র প্রতাপসিংহ। পুত্রের নাম অমরেন্দ্র প্রতাপসিংহ। ডাকতো অমর বলে। সমরেন্দ্র প্রতাপ সিংহের এখন বানপ্রস্থে যাবার বয়স। এখন তার বনে গিয়ে ঈশ্বরের সাধনায় একাকী নিমগ্ন হওয়ার সময়। রাজপুত্রের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে রাজা বানপ্রস্তে যান। মন্ত্রী আর সভাসদদের দিক-নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধায়নে রাজ্যব্যবস্থা ভালোই চলছিল। প্রজারা বেশ সুখেই ‍দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে, সুদিন চিরস্থায়ী হয় না। সময়ের চাকা চললো উল্টো পথে। রাজকুমার ধীরে ধীরে রাজকাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেললো। তার অনীহা একদিকে যেমন প্রগাঢ় হল রাজকাজে অন্যদিকে তার একমাত্র মনোযোগ গড়ালো তার সুন্দরী স্ত্রীর ‍দিকে। স্ত্রী-সঙ্গ তার সমস্ত অন্ধত্বের কারণ হলো। এভাবে সে এক সময় মদ আর বাঈজী- বারবিলাসীদের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লো। নীতি-নৈতিকতার এই হীন অবস্থায় সে মানুষকে সম্মান করতে ভুলে গেল। সে তো এখন রাজা। রাজ্যের সবকিছুই তার। রাজ্যে সমস্ত যুবতী আর সুন্দরী নারীরাও তার। নারীরা তার এহেন নির্লজ্জ লালসার বলি হতে থাকল। সর্বত্র যেন আতঙ্ক। সে যা চাইতো তাই করতে লাগলো। প্রজাদের উপর উৎপীড়ন, রাহাজানি ছিল এই স্বৈরাচারী রাজার নিত্যকার কাজ। মন্ত্রী কী করবেন তার কোন কুলকিনারা করতে পারছিলেন না। কেননা রাজা অমর তার কোন কথা ভদ্রভাবে শুনতেই নারাজ। উল্টো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিলো সে। পুরো রাজ্য নৈরাজ্যের কালো ছায়ায় ঢেকে গেল।

রাজ্যে ছিল এক বুড়ি মা। তার ছিল তিনজনের দরিদ্র পরিবার। সত্তরোর্ধ্ব বুড়িমা, তার ছেলে কানু আর তাদের বলদ গাই মানু। বলদ হলেও মানু ছিল তাদের পরিবারে একজন। নামকাওয়াস্ত বলদ। মানু ছিল বুড়িমার কলিজার টুকরা যেমনটা তার ছেলে কানু। মানুর গাই-মা তাকে জন্মানোর সময় মারা যায়। তারপর থেকেই বুড়িমা মানুকে দেখাশুনা করে লালন পালন করে বড় করেছে, যেন তারই ছেলে। কারণ বুড়িমা তখন ছিলো নিঃসন্তান। কানুর জন্ম মানুর অনেক পরে। বলদ মানুর নামে মিলিয়েই কানুর নাম রাখে বুড়িমা। কানু আর মানু। দুই ভাই। বুড়িমা তাদের ভাই-ভাই সম্পর্ক পাতিয়ে দেয়। বলে দেয় মানুকে দাদা বলে ডাকতো। কানু বলদ মানুকে তার বড় ভাই মানতো, দাদা বলে ডাকতো, আর কখনো কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতো না। বুড়িমা সব সময় বিশ্বাস করতো কানুর কোন ক্ষতিই হবে না যতদিন মানু তার সাথে থাকবে। বুড়িমা একদিন খুব অসুস্থ হলো। মায়ের সেবা যত্নের জন্য কানু আর মানু খুব দৌড়াদৌড়ি করলো। তারা ডাক্তার ডাকলো। মানু সবসময় বুড়িমার পাশেই বসে থাকতো। আর কানু মায়ের পায়ের পাতায় তেল মালিশ করতো, ওষুধ খাওয়াতো।

কিন্তু বুড়িমার যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। বোবা প্রাণিটা মায়ের বিছানার পাশেই পড়ে থাকতো। বুড়িমা বুঝতেই পেরেছিল তার অন্তিম সময় কয়েক নিঃশ্বাসের ব্যবধান মাত্র। কানুর হাতটা মানুর মাথায় ঠেকিয়ে বুড়িমা মানুকে বুঝিয়ে দিলো মানু যে কানুর বড় ভাই। কানুর দেখভাল করা তার দায়িত্ব। বোবা প্রাণিটার চোখ দিয়ে অঝর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। প্রাণিরা বোবা বলেই নাকি মৃত্যুর দূতকে দেখতে পায়, মৃত্যুকে আগাম বুঝতে পারে। বুড়িমা পরক্ষণেই মারা গেলো। মানুর চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকল অশ্রু। কানু তো চিৎকার করে আর্তনাদ করতে থাকলো। মানু তাকে সান্ত্বনা দিলো। কানু গরুর গাড়িতে লাকড়ি তুললো, মানু একই তা বয়ে নিলো। আর গ্রামবাসী কানুকে সাহায্য করলো বুড়িমার মরদেহ শ্মশানঘাটে নিতে। চিতায় আগুন জ্বললো, বুড়িমার মরদেহ ক্রমশ ভস্ম হয়ে গেলো। কানুর কান্নার শেষ সান্ত্বনা তো একমাত্র মানু।

জীবন তো চলবেই। চলে গেলো কয়েক বছর। মানু আর কানু বেঁচে থাকবার উপকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। তারা বনে যায়। মানু ঘাস আর লতাপাতা খায়। কানু ফুল তুলে, সুমিষ্ট ফল আহরণ করে। সে ফল খায়, কিছু মানুকেও দেয়। সে শুক্ন ডালপালা আর গুড়ি সংগ্রহ করে, মানুর পিঠে বোঝাই করে।

এভাবে সময় যেতে যেতে কানু বড় হয়ে ওঠে। সে এখন এমন এক সুদর্শন সুপুরুষ হয়ে উঠেছে যেন শত্রুও তার দিকে তাকিয়ে থাকে, বিমোহিত হয়। কানুকে প্রতিবেশিরা দারুণ ভালো জানে। সে প্রতিনিয়তই তাদের নানা কাজে সাহায্য করে। মানু কম কিসে? সেও দেখতে দারুণ আর শক্তিশালী। গ্রামের সমস্ত বলদকে ছাড়িয়েছে তার আকার। মানু একবার রাজার ষাঁড়কে ধাওয়া করে এমন আঘাত করে যে রাজবৈদ্য তার সমস্ত ওষুধ দিয়েও তার স্বাস্থ্য ফেরাতে পারেনি। রাজা তো ঐদিন থেকে মানুর ওপর সেই খ্যাপা।

এমনি একদিন মানু আর কানু বনে যাচ্ছিল। পথে পুকুরের ধারে এক বটগাছের নিচে বসে তার বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ তার এক অদ্ভুত ঘটনা দেখলো। সাতজন অত্যন্ত সুন্দরী যুবতী পুকুরে স্নান করতে নেমেছে। কানু কখনই এমন অপূর্ব সুন্দরী যুবতীদের দেখেনি। তার চোখে যেন পলক পড়লো না। যুবতীরা পুকুরে নেমে আনন্দ করছিল আর খেলছিল। এদের মধ্যে একজন কানুকে দেখে ফেলে আর অঙ্গুলি নির্দেশ করে বাকিদের দেখায়। আর কানু তাদেরকে মোহাবিষ্ট হয়ে দেখছিল। আর যুবতীরাও তার সুঠাম দেহ দেখে মুগ্ধ হয়েছিল আর বারবার পেছন ফিরে তাকে দেখছিল। এক সময় এই যুবতীরাই তাকে তাদের সাথে খেলতে ডাকলো। ইশারা করলো আর বললো, ‘চলে এসো, জলে নামো, আমাদের সাথে খেলো।’ কানু ভয় পেলো। কারণ কে জানে না এই যুবতীরা কোন দেবী কিনা! নাকি রাক্ষসী! সে জানে না কিভাবে তাদের এই আহ্বানে সে সাড়া দিবে। যুবতীরা তাকে আবারও অনুনয় করে জলে খেলতে ডাকলো।

মানু কানুর কাছেই ছিল। সে জিজ্ঞেস করলো, ‘দাদা, কী করবো আমি?’ মানু অভয় দিয়ে বললো, ‘যা, খেল। ওদের ভয় পাবার কিছুই নেই। ওরা জলকুমারী। ওরা তোর কোন ক্ষতি করবে না। যদি কোন বিপদ দেখিস আমার কাছে চলে আসিস।’

কানুর পা কাঁপছে। পু্কুরের কাছে যাওয়া মাত্রই মৎস কন্যারা তাকে নিয়ে গেলো পুকুরের মাঝখানে। একজন জিজ্ঞেস করলো, ‘কী নাম তোমার?’ কানু তার নাম বললো। তার ভেতরে একটু সাহসের সঞ্চার হলো। সেও তাদের নাম পরিচয় জানতে চাইলো। তারাও একের পর এক তাদের পরিচয় ‍দিলো চপল-রঙ্গ-ভঙ্গিমায়।

প্রথম জন– আমার নাম পুষ্পকেতকী।

দ্বিতীয় জন– আমার নাম পুষ্পগন্ধা।

তৃতীয় জন– আমার নাম পুষ্পরেণু।

চতুর্থ জন– আমার নাম পুষ্পসারা।

পঞ্চম জন– আমার নাম পুষ্পবতী।

ষষ্ঠ জন– আমার নাম পুষ্পকুঁড়ি।

সপ্তম জন– আর আমার নাম পুষ্পাঞ্জলি।

কানু বললো, ‘তোমরা কারা?’ তার বললো, ‘আমরা জলকুমারী! আমরা সাত বোন। এবার আসো, খেলি।’ কানু বললো, ‘কী খেলা খেলবো! আমি তো কোন খেলাই জানি না।’ জলকুমারীরা একে অন্যের সাথে কথা বলে বললো, ‘আমরা লুকোচুরি খেলবো। আমরা জলের ভেতর লুকাবো, তুমি খুঁজে বের করবে। তারপর তুমি লুকাবে আমরা খুঁজে বের করবো। কিন্তু এক শর্ত!’

কী শর্ত তা জিজ্ঞেস করতেই তারা তাদের মনের কথা বলে দিলো, ‘হুম। আমরা লুকাবো। আর তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে। যদি খুঁজে না পাও তবে তুমি হারবে আর আমরা সবাই তোমাকে বিয়ে করবো। আর তুমি লুকাবে, আমরা খুঁজবো। যদি তোমাকে খুঁজে না পাই তুমি আমাদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করবে আর বিয়ে করবে।’

কেমন এক অসম চুক্তিতে আটকে যায় কানু। কি করবে সে বুঝতে পারে না। সে কি রণে ভঙ্গ দিবে? না, সে ভাবে মানুকে জিজ্ঞেস করা যায়। জলকন্যাদের কাছে অনুমতি চাইলে তারা ভাবে বলদ কী এমন পরামর্শ দিবে। তারা অনুমতি দেয় আর খুব আনন্দ বোধ করে এই ভেবে যে তারা জলকন্যা, তারা লুকাবে জলে। কানু খুঁজেই পাবে না। কানু নিশ্চিত হারবে। আর তার সবাই নিশ্চিত, কানুর মতো এক সুপুরুষকে বিয়ে করতে যাচ্ছে!

কানু সবই খুলে বলে মানুকে। মানু হাসতে থাকে। আর কানুকে নিশ্চিত করে জলকন্যারা হারবে আর কানু জিতবে। ‘কিন্তু কী করে তাই তো বলবে!’ কানু জিজ্ঞেস করে। মানু বলে দেয় পুকুরের ঠিক মাঝখানে ঐ যে লালপদ্ম, তারই পাতার নিচে তারা লুকাবে। কানুকে গিয়ে তাদের ছুঁতে হবে। কানু কোথায় লুকাবে তার জবাবে মানু বলে, ‘ঘাবড়াস না ভাই। যখন তোর পালা আসে তুই তখন একটা জোঁক হবি আর আমার নাকের মধ্যে লুকাবি। তারা তোকে খুঁজে পাবে না। যখন তারা পরাজয় স্বীকার করবে, আমি তখন পানি খাবার ভান করে ঘাটে যাব আর তুমি পানিতে নেমে দেখা দিবি।’

কানু নিশ্চয়তা পেয়ে জলকন্যাদের কাছে গিয়ে তাদের শর্ত মানার কথা বললো। প্রথম জলকন্যাদের লুকালো। আর কানু তাদের লাল পদ্মপাতার তলায় পেলো। জলকন্যারা হেরে গিয়ে হতাশ হয়ে গেল। এবার কানুর পালা। কানু লুকালো। জলকন্যারা তন্নতন্ন করে খুঁজে বিধ্বস্ত হয়ে বললো, ‘হয়েছে কানু। আমরা হেরেছি। এবার দেখা দাও।’ মানু ঘাটে এলো যেন সে পানি খাবে। কানু তার নিজের চেহারায় ফিরে এলো। শর্ত মতো তাদের একজনকে কানু তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবে। প্রত্যেকেই চাচ্ছিল কানু যেন তাকে গ্রহণ করে। জলকন্যারা ঘাটে এসে কাপড় বদলে নিল আর বললো, ‘আমরা হেরে গেছি কানু। শর্ত মতো, আমাদের মধ্যে তোমার যাকে পছন্দ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করো।’

কী করে কানু? সবাই তো জ্বলজ্বলে সুন্দর। এভাবে তো নির্বাচন করা কঠিন! কিভাবে সে তাদের মধ্যে একজনকে নির্বাচন করবে! সে মানুকে জিজ্ঞেস করে। মানু বলে, ‘দেখ, তুই যদি সবচেয়ে বড় জনকে বাছাই করিস তবে, বাকি সবাই ছোট, ওরা কিন্তু তোকে বড় দুলাভাই বলে নানান ফাঁদে ফেলবে। তাই, তুই সবচেয়ে ছোটজনকে বাছাই করবি। এতে বড়রা তোমার ধারের কাছে ঘেষবে না।’ বুদ্ধিটা মন্দ না। কানুর পছন্দ হয়। কিন্তু মুশকিল তো আরেকটা। তারা সবাই দেখতে একই রকম। কে বড় কে ছোট তা কে জানে। তাই সে জানতে চায় কেমন করে বুঝবে কোন জন ছোট! মানু বলে সে একটি কালো ভ্রমর হয়ে ছোটকন্যার মাথার কাছে উড়বে আর ঘুরবে। কানুকে সেই কন্যার হাত ধরতে হবে। কানু জলকন্যাদের কাছে আসে। জলকন্যারা তার দিক অধীর হয়ে আগ্রহ নিয়ে তাকায়। কাকে সে গ্রহণ করতে যাচ্ছে! কানু বলে, ‘সুন্দরী জলকন্যারা শুনো, আমি তোমাদের মধ্যে ছোটজনকে আমার স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করতে চাই।’ এবার জলকন্যারা বলে, ‘বেশ, তবে কে আমাদের মধ্যে ছোট খুঁজে নাও। যদি ব্যর্থ হও তবে আমাদের সবাইকে বিয়ে করতে হবে।’ কানু তো সবই জানে, মানুই সব বলে দিয়েছে। কানু দেখতে পায় একটি কালো ভ্রমর এক জলকন্যার মাথার চারপাশে উড়ছে আর ঘুরছে। কানু সময় নষ্ট না করে তার হাত ধরে। বাকি জলকন্যারা আর কী করে? ছয় জলকন্যা তাদের ছোট এই বোনকে কানুর স্ত্রী হিসেবে দেয়। আর তারা বুঝতে পারে যে পুষ্পাঞ্জলির বড়বোন হিসেবে তাদেরকে কানুর থেকে দূরে থাকতে হবে। তাই তারা নবদম্পতির জন্য আশীর্বাদ করে পুকুরের পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

কানু অপূর্ব সুন্দরী পুষ্পাঞ্জলিকে নিয়ে মানুর কাছে আসে। মানু দুজনের দিকে আগ্রহ আর স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এ যে অতি আনন্দের। কানু মানুকে তার বড়দা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারা মানুর ‍পা ছুঁয়ে গড় হয়ে প্রণাম করে। মানুও তাদের জিহ্বা দিয়ে চেটে স্নেহ প্রকাশ করে। মুখের সাথে মুখ ঘষে প্রকাশ করে অকৃত্রিম ভালোবাসা।

যেহেতু তারা গ্রাম থেকে বেশ দূরে চলে এসেছে আর সন্ধ্যাও সমাগত, তাই তারা বাড়ির দিকে যাত্রা করল। যখন তারা বাড়ি ফিরল তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। গ্রামবাসী এমন সুন্দর জলকন্যাকে এমনভাবে দেখতে থাকলো সে এমন অদ্ভুত ঘটনা কেউ ভাবতেও পারে না। লোকজন কানুকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কানু সবাইকে বলে সে তার স্ত্রী। কানুর অপূর্ব সুন্দরী কুমারীকে বিয়ের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। পৌঁছে যায় রাজার কানে। রাত অনেক পড়েছে। কানু আর মানু আর আগের মতো এক সাথে থাকতে পারে না। মানু ঘরের বাইরে ঘুমায়। কানু ঘুমায় পুষ্পাঞ্জলির সাথে পরম সুখে।

এদিকে রাজা অমর তো স্থির থাকতে পারছে না যখন শুনেছে কানু এমন অত্যন্ত সুন্দরী এক কুমারীকে বিয়ে করেছে। সে কানুর কাছে সংবাদ পাঠায় যে কানুকে দরবারে আসতে হবে। কানু দরবারে যায়। রাজা অমর তাকে জিজ্ঞেস করে কোত্থেকে সে এমন সুন্দরী যুবতী কুমারীকে এনেছে। কানু সব বলে। কিন্তু রাজা তার কথা বিশ্বাস করে না। উল্টো সে কানুকে অপবাদ দেয় যে সে ঐ নারীকে কোথাও হতে চুরি করে এনেছে। কানু অনুনয় করে বলে চাইলে সে প্রমাণ দিতে পারে যে সে সত্য বলেছে। কিন্তু রাজার মনে আছে অন্য ফন্দি। সে কানুর কথায় কান না দিয়ে পাল্টা নির্দেশ দিলো তার বৌকে উপহার হিসেবে রাজার জন্য পাঠাতে। কানু হাঁটু গেড়ে নত হয়ে এই আদেশ না দেবার মিনতি করলে রাজা তার প্রহরী দিয়ে দরবার থেকে বের করে দিলো। কানু কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে এসে মানুকে সব খুলে বললো। মানু অভয় ‍দিয়ে বললো, ‘দুশ্চিন্তা করো না। যতদিন আমি বেঁচে আছি কেউ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

এসব শুনে পুষ্পাঞ্জলি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। মানু তাকে অভয় দিয়ে বললো ঘরের বাইরে পা না ফেলতে আর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ পর রাজার পেয়াদারা এসে হাজির হলো পুষ্পাঞ্জলিকে নিয়ে যেতে। কানু ভেতর থেকে জবাব ‍দিলো তা কখনই করা হবে না। পেয়াদারা জোর করে ঘরে ঢুকতে চেষ্ট করলো কিন্তু আগলে দাঁড়ালো মানু। সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তাদের রুখে দিলো। শুধু রুখেই দিলো না, এমন তাড়া করলো যে তারা প্রাণে পালিয়ে গেলো। কানুর শক্তি সম্পর্কে আরো একবার সবাই জানতে পারলো। রাজা বুঝতে পারলো যতদিন মানু বাঁচে থাকবে ততদিন পুষ্পাঞ্জলিকে তার পাওয়া হবে না। তাই সে ভাবলো যে করেই হোক মানুকে হত্যা করতে হবে। একটা পরিকল্পনাও সে করলো। আস্তাবলের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোড়ার সাথে মানুকে লড়তে হবে। কানু আর মানুকে প্রাসাদে ডেকে এনে জানানো হলো যদি মানু পরাজিত হয় তবে পুষ্পাঞ্জলিকে রাজার হাতে তুলে দিতে হবে।

মানু আর কানু এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করলো। মানু এক রণহুঙ্কার দিয়ে এই যুদ্ধকে স্বাগত জানালো। কানু আর রাজ্যের সবাই সেখানে সমবেত হলো। যুদ্ধ শুরু হলো। মানুর হুঙ্কারে আকাশ-বাতাস কম্পিত হলো, পদক্ষেপে কম্পিত হলো জমিন, রাজার প্রাসাদ আর শক্তিশালী ঘোড়া। সমবেত প্রজাগণ মানুকে প্রশংসা, সাহস আর উৎসাহ দিতে লাগলো। ক্ষণিকের মধ্যেই রাজার শক্তিশালী ঘোড়াকে তীক্ষ্ম শিং- এ তুলে দ্রুম করে মাটিতে আছড়ে ফেললো মানু। ঘোড়া দিগ্বিদিক ছুটে আস্তাবলের দিকে পালালো। ক্রোধে ক্ষোভে রাজা স্থান ত্যাগ করলো। বিজয়ের রোল পড়ে গেলো রাজ্যের সর্বত্র। আস্তাবলের শক্তিশালী ঘোড়া গেছে। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকলো রাজা। এবার সে সমন জারি করলো রাজার শক্তিশালী হাতির সাথে শক্তির পরীক্ষা দিতে হবে মানুকে। আর মানুর পরাজয় মানে পুষ্পাঞ্জলিকে অর্পণ।

সমন শুনে কানু চরম ভাবনায় পড়ে গেলো। পুষ্পাঞ্জলি কান্নায় ভেঙে পড়লো। কানুও মানুর কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। মানু তাদের অভয় দিয়ে বললো, ‘কাঁদিস না, আমি রাজার হাতির বিরুদ্ধে লড়বো, আমার কিচ্ছু হবে না।’ মানু প্রাসাদের দিকে রওনা দিলো, কানুও তার অনুসরণ করলো। পুষ্পাঞ্জলি দরজায় খিল দিয়ে ভেতরে কাঁদে থাকলো। প্রজারা জড়ো হলো ময়দানের চারপাশে।

যুদ্ধ শুরু হলো। মানু কেবল হাতিটার পায়ের দিকে থেকে পদক্ষেপ নিরীক্ষণ করে সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকলো। কানু খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। অন্যদিকে মানু এক মোক্ষম সুযোগ পেয়ে তার তীক্ষ্ম শিং দিয়ে হাতির শুরে এমন আঘাত করলো যে শুরের ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত আসলো। একই সাথে রাজার হাতি বুঝতে পারলো মানুর শিং-এ তার পা বারংবার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। এবার মানু হাতির চার পাশে সাত বার ঘুরে এসে হাতির পেটে সবেগে শিং দিয়ে এমন জোরে আঘাত করলো হাতি মুহূর্তেই ভূমিসাৎ হলো। চারপাশ ‍বিজয়ের ধ্বনিতে মুখরিত হলো। রাজা চরম অপমান আর ক্রোধে ফেটে পড়লো। ঘোষণা দিলো এবার মানুকে লড়তে হবে কুস্তিগীরদের সাথে। কুস্তিগীররা তো মানুর শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তারা ভয়ে শিটিয়ে গেলো। কিন্তু রাজার কথার অবাধ্য হলে যে এখনই গর্দান যাবে। কানু আর মানু ঘরে ফিরলো বিজয়ের মালা নিয়ে। কানু আর পুষ্পাঞ্জলি দারুণ যত্ন নিলো মানুর। ভালো, সুস্বাদু আর পুষ্টিকর খাবার দিলো মানুকে।

পরদিন সবাই ময়দানে এলো কুস্তিগীর আর মানুর যুদ্ধ দেখতে। কানু-মানুও আসলো। কিন্তু কোন কুস্তিগীরকেই দেখা গেলো না। জানা গেলো গতরাতেই কুস্তিগীররা পালিয়েছে। সবাই রাজার দিকে আঙ্গুল দিয়ে অট্টহাসি দিয়ে খেলো রাজাকে অভিনন্দন জানালো। রাগে কটমট আর গর্জন করতে করতে প্রাসাদে ফিরে এলো রাজা। যে করেই হোক মানুকে মারতে হবে। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝলো মানুকে আর যাই হোক শক্তি দিয়ে মারা যাবে না। সে ফন্দি আঁটতে থাকলো। সে ঘোষণা করলো মানুকে কলাগাছের সাথে লড়তে হবে। প্রজারা খুবই হাসলো। শয়তান এবার পাগল হয়েছে। মানু ইতোমধ্যে হাতি-ঘোড়া করেছে, কুস্তিগীররা পালিয়েছে। এখন রাজা বলছে মানুকে লড়তে হবে কলাগাছের সাথে! কানু আর পুষ্পাঞ্জলিও বুকচাপড়ে হাসতে লাগলো। কিন্তু মানুর নীরবতায় ছিল শঙ্কার আভাস। কী হয়েছে মানুর? তাকে এমন বিমর্ষ আর বিষণ্ন লাগছে কেন? মানু বললো, ‘আমি এবার আর তোদের বাঁচাতে পারবো না। আমার সময় শেষ।’ কানু কারণ জানতে চাইলে মানু বলে, ‘এই কলাগাছই হবে আমার মৃত্যুর কারণ। রাজা কলাগাছের ভিতরে বারো হাত লম্বা চার চারটি ধারলো তলোয়ার চার দিক থেকে এমনভাবে সাজাবে যে আমি তাতে আঘাত করা মাত্রই তা আমাকে মুহূর্তেই টুকরো টুকরো করে ফেলবে।’ একথা শোনার পর কানু আর পুষ্পাঞ্জলি স্তব্ধকান্নায় মানুকে জড়িয়ে ধরলো। ভেতর থেকে কান্না যেন তাদের কলিজায় হাতুড়ি পেটিয়ে করে যাচ্ছে। তারা মানুকে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করলো। কিন্তু মানু ভীরু নয়, কাপুরুষ নয়, মৃত্যুর ভয় করে না সে। উল্টো সান্ত্বনা দিয়ে মানু বলে, ‘যে জীবন এ ধরায় এসেছে একবার, একদিন তাকে নিতে হবে স্বাদ মরবার। তবে কেন মৃত্যুকে ভয় করতে হবে? আর শোন, আমি মারা গেলেও তোদের কোন ক্ষতি হবে না।’ তারা জানতে চায় কিভাবে সে এত নিশ্চিত! মানু বলে, ‘শোন, আমি কলা গাছের সাথে লড়েই মরবো। আমার মৃত্যুর পর আমার একটি হাড় আর নাড়ি আলাদ রেখে আমাকে কবর দিস। কেউ যেন আমার শরীর স্পর্শ না করে।’ এই বলি মানু থামে। কানু আর পুষ্পাঞ্জলি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। তারা ভাবতে পারে না, তাদের মানু কাল জীবন দিতে যাচ্ছে! মানু আবার বলে, ‘আমার হাড় আর নাড়ি হবে তোদের রক্ষাকবচ।’ কানু আর পুষ্পাঞ্জলি শোনে আর চোখ মুছে। মানু বলে যায়, ‘যখন কোন শত্রু আক্রমণ করতে আসবে, বলবি ‘বেঁধে ফেলো, কাছি; পেটাও ওদের মুগুর’ আর তখন একটা শত্রুও পালাতে পারবে না। ‘হাড় হবে মুগুর আর নাড়ি হবে কাছি।’ আর অমনি কাছি ওদের বেঁধে ফেলবে, মুগুর ওদের পেটাতে থাকবে। যখন তারা নতি স্বীকার করবে তখন বলবি, ‘বেশ হয়েছে থাম, এটা মানুদা’র আদেশ।’ অমনি তা থেমে যাবে।’ রাতে তারা অনেক গল্প করে। মানুই কানু আর পুষ্পাঞ্জলিকে প্রবোধ দেয়। সকাল হয়। হাজারও লোক সমবেত হয়েছে ময়দানে। রাজা যুদ্ধের নির্দেশ দেয়।

মানু সবার দিকে তাকায়। কানু তাকে ছাড়তে চায় না। পুষ্পাঞ্জলি ঘরের কোণে কেঁদে যায়। কেউ বুঝতে পারে না কানু কেন মানুকে জড়িয়ে কাঁদে। মানু কলাগাছের দিকে ধাবমান হয়। আঘাতের পর আঘাত করে। আর ক্ষত-বিক্ষত, ছিন্ন-ভিন্ন হয় মানুর শরীর। কানু নতজানু হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কানু যখন মানুর মৃত শরীর বাড়ি নিয়ে আসে পুষ্পাঞ্জলি তখন মানুর মৃত শরীর জড়িয়ে কাঁদে। তারা মানুর আদেশ মতো একটি হাড় আর নাড়ি তুলে রেখে মানুকে এক নির্জন স্থানে করব দেয়। তারা সারারাত একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।

পরদিন সকালেই রাজার দূত এসে জানায় পুষ্পাঞ্জলিকে রাজার হাতে সোপার্দ করতে হবে। কানু ভেতর থেকে জানায় তা সে এই জীবন থাকতে করবে না। রাজদূত এই কথা রাজাকে বলা মাত্রই চরম ক্রোধে রাজা সৈন্য-সামন্ত নিয়ে রা রা করে কানুর বাড়িতে এসে হাজির হয়। সৈন্যরা ঘরের দরজায় আঘাত করতে গেলে কানু বলে ‘বেঁধে ফেলো, কাছি; পেটাও ওদের, মুগুর’। অমনি কাছি শত্রুদের বেঁধে ফেলে, মুগুর করে মুগুর পেটা। মুগুরের পিটুনি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে সৈন্যরা জীবন নিয়ে পালাতে যায়। কিন্তু তারা তো কাছি দিয়ে বাঁধা। রাজা আর সইতে না পেরে হাত উঁচু করে আত্মসমর্পন করে। কানু বলে, ‘বেশ হয়েছে থাম, এটা মানুদা’র আদেশ।’ অমনি সব থেমে যায়। লজ্জিত-লাঞ্ছিত খেলো রাজা খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘোড়ায় উঠে প্রাসাদে ফিরে যায়।

রাজমন্ত্রী বুদ্ধিমান লোক। বলে কানুকে সেনাপতি বানাতে। যেদিন থেকে কানু সেনাপতি পদে বহাল হয় সেদিন থেকে রাজ্যে আসে স্বস্তি আর শান্তি। সবাই কানু আর পুষ্পাঞ্জলির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। যেখানে মানু শায়িত সেখানে নির্মিত হয় তার স্মৃতিস্তম্ভ। স্তম্ভে খোদিত হয় মানুর ছবি। সমস্ত এলাকায় বাগান রচনা করা হয়। কানু আর পুষ্পাঞ্জলি প্রতি প্রভাতেই আসে অঞ্জলি দিতে মানুর কবরে। রাজ্যের সব সমস্যা নিষ্ক্রান্ত হয়।

Check Also

বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তি এবং সাহিত্য চর্চাঃ

সাদিয়া আক্তারঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের অধিক কালেরও পুরানো। এই দীর্ঘ ইতিহাসের পেছনে গভীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *