Tuesday , September 26 2017
হোম / জাতীয় / পানি আর খাদ্য পেতে মরিয়া অস্থায়ী শিবিরের রোহিঙ্গারা

পানি আর খাদ্য পেতে মরিয়া অস্থায়ী শিবিরের রোহিঙ্গারা

অনলাইন ডেস্ক :  রাখাইনের সহিংসতা থেকে বাঁচতে স্রোতের মতো ধেয়ে আসা বিপন্ন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষরা অমানবিক দিন যাপন করছেন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। প্রয়োজনীয় খাবার আর পানির অভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের জীবন। কোনওরকমে নিজেদের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলেও তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার পথ পাচ্ছে না। এমন বিপন্নতার মধ্যেই বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৫৭ কোটি ১২ লাখ টাকার সহায়তা ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। তবে এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, এই বিপুল পরিমাণ মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তারা অক্ষম।

সাম্প্রতিক ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের লক্ষ্যে সেনা অভিযান শুরুর কয়েক দিনের মাথায় ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গা’রা ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের সমন্বিত হামলায় অন্তত ১০৪ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়ে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান জোরদার করে সরকার। এরপর থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশছে মৌসুমী বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ছেন সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হচ্ছে তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে মানুষকে। আহত শরণার্থী হয়ে তারা ছুটছে বাংলাদেশ সীমান্তে। গত দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতো অল্প সময়ে এই বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ করায় বাংলাদেশে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির খবর অনুযায়ী, বন্যার মতো ধেয়ে আসা শরণার্থীরা খাবার আর পানির জন্য হাহাকার করছে। সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সংবাদকর্মীদের গাড়ি থামিয়ে জানালায় খাবার আর পানির আকুতি জানাচ্ছে রোহিঙ্গা নারীরা। কখনও কখনও সংবাদকর্মীদের কাপড় টেনে ধরে থামাতে চাইছে তাদের। নারীরা তাদের বাচ্চাদের দেখিয়ে খাবার ভিক্ষা চাইছে। এদিকে ত্রাণকেন্দ্রে বাড়ছে ভীড়। ২৫ কিলোগ্রাম চাল আর কয়েক প্যাকেট বিস্কুট পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এবিসি নিউজের খবরে উঠে এসেছে অস্থায়ীভাবে নির্মিত শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের বিপন্নতার চিত্র। একটি অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরের নেতা নূর মোহাম্মদকে উদ্ধৃত করে এবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  নতুন শরণার্থী যারা এসেছে তাদের অনেকেই দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। অনেকেই তিন দিন ধরে অভুক্ত আছে। তাদের রান্না করার মতো কিছু নেই, কিছু একটি বিছিয়ে যে ঘুমাবে সেরকম কিছুও নেই। অনেক শিশুর কোনও পোশাক নেই গায়ে, তারা উলঙ্গ অবস্থায় আসছে। নূর মোহাম্মদ এবিসি নিউজকে জানান, শরণার্থীদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র অভাব রয়েছে। সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

প্রাণের ভয়ে সবকিছু ছেড়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়া এলাকাগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক নতুন টিউবওয়েল স্থাপন করা হলেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এবিসি নিউজ জানিয়েছে, কুটুপালং শরণার্থী শিবিরের চারদিকে দুর্ভোগ ও দুর্দশা চোখে পড়ে। পুরো পরিবার, অসুস্থ মানুষ, আহত মানুষ, বৃদ্ধ থেকে নবজাতকরা একটু আশ্রয়, খাবার ও পানির জন্য হাহাকার করছে।

প্রতিদিন নতুন করে আসার রোহিঙ্গারা জঙ্গলের গভীরে আশ্রয় নিচ্ছেন। পাহাড়ি এলাকায় টিলা কেটে বাঁশে তারপুলিন টানিয়ে কোনওরকম মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করছে এসব শরণার্থীরা। কোনও গাড়ি দেখলেই তারা খাবারের আশায় জড়ো হচ্ছে। কেউ কেউ পাচ্ছে কিন্তু যারা পাচ্ছে না তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকছে আরও গাড়ি আসার অপেক্ষায়।

একটি অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে আলি জোহার ও তার স্ত্রী খুদিজা। বিধ্বস্ত ও নির্বাক খুদিজার কোলে দুই দিনের এক নবজাতক। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ পালিয়ে আসার পথে জঙ্গলে এই শিশুর জন্ম হয়েছে। মেয়েটির এখনও নাম রাখা হয়নি। কিন্তু তার জীবন শুরু হয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে, যেখানে নেই বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন বা বেঁচে থাকার মতো সব সরঞ্জাম। নবাজতক মেয়ের বাবা আলি জোহার জানায়, ‘আমি দুই দিন আগে বাংলাদেশ এসেছি। কারণ কয়েকজন বৌদ্ধ এসে আমাদের ছুরিকাঘাত করতে থাকে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। আমার বাড়ি পুড়ে গেছে। সঙ্গে কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি।’

ইউএনএইচসিআর-র বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার শিন্নি কুবো বলেন, ‘আমার ভয় হচ্ছে, আরও মানুষ আসবে। তাদের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের বিশাল অংকের আর্থিক সহেযাগিতা প্রয়োজন। এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এই পরিস্থিতি আকস্মিক। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে এই পরিস্থিতি চলবে।’

শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিশুদের বিপন্নতা তুলেএনেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাও। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশুদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেকেই তাদের বাবা-মাকে পালিয়ে আসার পথে হারিয়েছে। কেউ আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে থাকছে। অনেকেই আবার পুরোপুরি একা। এসব শিশুদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে ভিভিয়ান জানান, এসব শিশুদের রক্ষার জন্য বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থা ও এনজিওদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার নামের এনজিও শিশুদের গরম খাবার ও সহায়ক খাদ্য ও পুষ্টির সরবরাহ করছে। কিন্তু অপুষ্টির শিকার হয়ে অনেকেই অসুস্থ আছে। ভিভিয়ান আরও বলেন, দুঃখের বিষয় হলো শুধু তারা ভ্রমণের কারণেই এই অবস্থায় পড়েনি। পালিয়ে আসার আগেও কয়েকদিন ধরে না খেয়ে ছিল তারা।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৫৭ কোটি ১২ লাখ টাকা সহায়তা ঘোষণা করা হয়। তবে এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান এ কথা স্বীকার করেছেন। আল জাজিরার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৭০ হাজার শরণার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য জাতিসংঘের রয়েছে কি-না। জবাবে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন,  ‘আমাদের যথেষ্ট সামর্থ্য নেই। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আমার যে চিত্র দেখেছি তাতে আমাদের কী প্রয়োজন তা জানা গেছে। আমাদের তহবিলের জন্য আবেদন জানাতে হবে।’

ইউএনএইচসিআর-র মুখপাত্র বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমরা দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রথমত জরুরি প্রয়োজন যা জীবন বাঁচাতে দরকারি। যেমন- মানুষকে খাবার, পানি ও থাকার ব্যবস্থা করা এবং যদি চিকিৎসা সহযোগিতা প্রয়োজন তা দেওয়া। আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও ভূমি কেনার বিষয়ে আলোচনা করছি। কারণ যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে তাহলে চরম অবস্থা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত মানুষের ফলে স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। এমনকি স্থানীয়দের সঙ্গেও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে সতর্কতা ও ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দরকার।

Check Also

রোহিঙ্গারা যতদিন আসবে আমরা ততদিন আশ্রয় দেবো: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক :  মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা যতদিন আসবে বাংলাদেশ তাদের ততদিন আশ্রয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *