Tuesday , December 12 2017
হোম / ব্যবসা বানিজ্য / ফেরত আসে না চামড়া কিনতে দেওয়া ঋণ

ফেরত আসে না চামড়া কিনতে দেওয়া ঋণ

অর্থনীতি ডেস্ক : চামড়া কিনতে সরকারি ব্যাংক থেকে দেওয়া ঋণ আর ফেরত আসে না।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চামড়া কিনতে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তারা তা ফেরত দিচ্ছেন না বা আদায় হচ্ছে না। বর্তমানে চামড়া কিনতে দেওয়া ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশই বকেয়া রয়েছে। আর বেশিরভাগ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে কোনও জামানত না থাকায় মামলা করেও তা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই খাতে মামলা পরিচালনার টাকাও নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চামড়া খাতের ৮০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়েছে।বাকি ২০ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। এ অবস্থায় ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমছে। আগে সোনালী ব্যাংক ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলেও এখন দিচ্ছে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে। একইভাবে জনতা ব্যাংক ৭৮টি থেকে কমিয়ে ২০টি, রূপালী ব্যাংক ৩০টি থেকে কমিয়ে চারটি এবং অগ্রণী ব্যাংক ৭৫টি থেকে কমিয়ে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানকে চামড়া কিনতে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জানা গেছে, জনতা ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল বেঙ্গল লেদার্স। সুদসহ ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ৪০ কোটি টাকা। কিন্তু এক পয়সাও পরিশোধ করেনি এই প্রতিষ্ঠানটি। ফলে এ ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। নিয়মানুযায়ী কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করে ব্যাংক। পরে বাধ্য হয়ে ৪০ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করে ব্যাংকটি।

এছাড়া পূবালী ট্যানারি ৩৬ কোটি টাকা ঋণ নেয় রূপালী ব্যাংক থেকে। ওই ঋণের টাকাও ফেরত না পেয়ে অবলোপন করতে বাধ্য হয় ব্যাংকটি। এভাবে চার ব্যাংক থেকে অন্তত ২৫০টি ট্যানারি এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। ওই টাকায় তারা এখন অন্য ব্যবসা করছে।

চমড়া খাতের মিলন ট্যানারি নামের এক প্রতিষ্ঠান প্রায় ২২৩ কোটি টাকা দায় নিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। পরে এই টাকা আদায় হয়নি। মালিকপক্ষ এখন অন্য ব্যবসা করছে। ব্যাংক তার ওইসব ব্যবসা থেকে টাকা আদায়ের কোনও উদ্যোগ না নিয়ে ঋণ অবলোপন করেছে। সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় শতাধিক ট্যানারির মালিক ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ গ্রাহক ঋণের টাকা ফেরত দেননি। বাধ্য হয়ে প্রায় ১৫৫ কোটি অবলোপন করেছে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,চামড়া খাতে প্রতিবছর যে পরিমাণে ঋণ দেওয়া হচ্ছে তার সিংহভাগই আদায় হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণ অবলোপন (ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে আলাদা রাখা) করছে।

আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চামড়া খাতের ঋণের বড় অংশই অন্য খাতে স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে। ফলে এ খাতে খেলাপি ঋণের মাত্রা বেশি। এসব ঋণ আর কখনও আদায় হয় না।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ব অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘একটা সময় ছিল চামড়া কিনতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিতো না। এখন সময় বদলেছে। এখন যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছেন তাদেরকে ফেরত দিতেই হবে। এবছর আমরা তাদেরকেই ঋণ দিয়েছি, যারা অতীতে টাকা ফেরত দিয়েছে। এছাড়া যারা সাভারে যেতে পারেননি তাদেরকেও ঋণ দেওয়া হচ্ছে না।’

তিনি আশা করে বলেন,‘যারা সাভারে গেছেন, তারা ব্যবসা ভালো করবেন এবং ব্যাংকের টাকাও ফেরত দেবেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক গত ৫ বছরে চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে প্রায় ৬৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড মিলে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ঋণ গেছে নিয়মিত চামড়া শিল্পে। বাকি ৫৮৩ কোটি টাকা গেছে কোরবানির চামড়া ক্রয়ে। এসব ঋণ মোট ১০ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে প্রায় ৫৫৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ভুলুয়া ট্যানারি, আমিন ট্যানারি, কালাম ব্রাদার্স ট্যানারি এবং মোহাম্মদিয়া লেদারের কিছু টাকা বকেয়া থাকলেও লেনদেন নিয়মিত আছে। কিন্তু বাকি ৬ প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এসব ঋণ পুরোটাই এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, মেসার্স ভারসেজ সুজের কাছে সোনালী ব্যাংকের বকেয়া রয়েছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। একইভাবে গ্রেট ইস্টার্ন ট্যানারির কাছে এক কোটি টাকা, এক্সিলেন্ট ফুটওয়্যারের কাছে প্রায় ১০ কোটি টাকা, দেশমা সু ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি, এসএনজেট ফুটওয়্যারের কাছে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা এবং আনান ফুটওয়্যারের কাছে ব্যাংকের বকেয়া রয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। এসব ঋণ বর্তমানে খেলাপি হয়ে গেছে। এবছর তিন প্রতিষ্ঠানকে ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান আগের ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। ঋণ পরিশোধে তাদের জন্য সময় বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান দুটি আরও নতুন ঋণ নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরনো সব প্রতিষ্ঠানই খেলাপি। কেউ টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। গত বছরের নেওয়া আমিন ট্যানারি ২৫ কোটি ও কালাম ব্রাদার্স ট্যানারি ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান দুটি আরও এক বছর সময় নিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটি আরও ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) স্বপন কুমার সাহা বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে যে তিনটি প্রতিষ্ঠান ভাল ব্যবসা করছে, তাদেরকেই এবার ঋণ দেওয়া হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধে দুটি প্রতিষ্ঠানকে আরও এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে সোনালী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক মিলে এই খাতে মোট ঋণ বিতরণ করেছে এক হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ ঋণই খেলাপি হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে।

Check Also

কৃষিপণ্য উৎপাদনে দেশ এগিয়েছে বহুদূর

অনলাইন ডেস্ক : স্বাধীনতার ৪৬ বছরে কৃষিক্ষেত্রে দেশ বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৭০ সালের আগে বাংলাদেশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *