Friday , September 22 2017
হোম / শিক্ষা / অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষা

অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষা

অনলাইন ডেস্ক :  দেশে শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই বেতন-ভাতা বাবদ। সে তুলনায় মূলধনি বা অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় সামান্যই। প্রয়োজন বেশি থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামো ব্যয়ের অংশ আবার আরো কম। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয়িত অর্থের ৪ শতাংশও যাচ্ছে না অবকাঠামো উন্নয়নে।

যদিও সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো। দেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়েরই ভবন থাকলেও ছাদ নেই। ছাদ থাকলেও তা ভাঙাচোরা। ফলে ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চলছে এসব বিদ্যালয়ে। অতি ঝুঁকিপূর্ণের কারণে পরিত্যক্ত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠ নিতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। বরাদ্দের অপ্রতুলতায় অবকাঠামো সংকট থেকে বেরোতে পারছে না এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়।

ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের মোট ব্যয় ছিল ১৩ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয় মাত্র ৫১২ কোটি টাকা। সে হিসাবে ওই অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ গেছে অবকাঠামো উন্নয়নে।

বরাদ্দের অপ্রতুলতায় পরিত্যক্ত ঘোষণার তিন বছরেও নতুন ভবন পায়নি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে চলছে বিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বন্দেখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাকা ভবন নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ফাটল দেখা দিলে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে প্রকৌশল বিভাগ। এর পর কয়েক বছর ধরে পাশের লিচুবাগানে পাঠ নিচ্ছে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। একই অবস্থা হরিণাকুণ্ডুর ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও। বিদ্যালয়টির শিক্ষক সালাম উদ্দিন বলেন, নির্মাণকাজ নিম্নমানের হওয়ায় ভবনগুলোর বিভিন্ন স্থান খসে পড়ছে। এগুলো এখনই মেরামত করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ভবন সংকট ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষায় ঘাটতি আছে শিক্ষার্থীদের আসবাব, হাই ও লো বেঞ্চ এবং শিক্ষকদের জন্য চেয়ার-টেবিলেরও। পানি ও স্যানিটেশনেরও অপর্যাপ্ততা রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, এসব সংকট নিয়েই চলছে দেশের ৫৬ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

অবকাঠামো সংকটের কথা স্বীকার করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামানও। তিনি বলেন, এসব সমস্যা দূর করতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, কোনো অর্থবছরই তা দেয়া হয় না। বাজেটের মোট আকার বাড়ানোর ফলে টাকার অংকে এ খাতেও বরাদ্দ বাড়ছে। তবে শতাংশের হিসাবে তেমন বাড়ছে না। তার পরও যা পাওয়া যাচ্ছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় বিদ্যালয় নির্মাণ এবং সংস্কারবিহীন স্কুলগুলোকে মেরামত ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে। চাহিদা অনুসারে পর্যায়ক্রমে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।

অবকাঠামো ব্যয়ের চিত্রে প্রাথমিকের চেয়ে ভালো অবস্থানে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা।

ব্যানবেইসের এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস রিপোর্ট-২০১৬ অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর নিম্ন মাধ্যমিকে মোট ব্যয়ের ৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ ছিল পৌনঃপুনিক বা বেতন-ভাতা ও পেনশনে। এর বিপরীতে অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয় ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। মাধ্যমিক শিক্ষায় পৌনঃপুনিক ব্যয় ছিল ৮৭ দশমিক ৬৩ ও অবকাঠামো খাতে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে অবকাঠামো ব্যয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে উচ্চশিক্ষা। শিক্ষার এ স্তরে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পৌনঃপুনিক ব্যয় ছিল মোট ব্যয়ের ৭৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর বিপরীতে অবকাঠামো ব্যয় হয় ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ।

শিক্ষায় মোট সরকারি ব্যয়েও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের ব্যয় মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) মাত্র ২ দশমিক ১৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। দেশটি জিডিপির ৫ দশমিক ৭১ ব্যয় করেছে শিক্ষা খাতে। অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারত জিডিপির ৩ দশমিক ৮৪, পাকিস্তান ২ দশমিক ৬৬, আফগানিস্তান ৩ দশমিক ৩৮ ও নেপাল ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যয় করেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। আর বাজেটে উন্নয়ন খাতের তুলনায় অনুন্নয়ন বরাদ্দ বেশি বাড়ানো হয়। অথচ অনুন্নয়ন খাতের সিংহভাগ অর্থ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, ভাতা কিংবা পেনশনে। এছাড়া আমাদের দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে দুর্নীতি।

যদিও ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৪ শতাংশ বরাদ্দকে আদর্শ মান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর চেয়ে কম বরাদ্দকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, বাজেট দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়— এ দুই মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে অবশ্যই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কারণ সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ন্যূনতম ৪ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। অথচ বর্তমান বাজেটে জিডিপির ৩ শতাংশও বরাদ্দ করা হয়নি শিক্ষা খাতে।

Check Also

৩৬ ও ৩৭তম বিসিএসের ফল অক্টোবরে

অনলাইন ডেস্ক : সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ৩৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ও ৩৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফলাফল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *