Sunday , September 24 2017
হোম / জাতীয় / রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের একমাত্র চাবিকাঠি যার হাতে

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের একমাত্র চাবিকাঠি যার হাতে

অনলাইন ডেস্ক :  মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হিলাইং সম্ভবত দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। এমনকি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিগুলোও তার পথে বাধা হতে আগ্রহী নয়। এজন্যই মনে করা হচ্ছে, তিনিই চলমান রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস স্কর্চড আর্থ অভিযান শিগগিরই থামাতে পারেন।  সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এখণ প্রায় ৪ লাখ। কিন্তু ৬১ বছর বয়সী এই সেনাপ্রধান নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বন্ধে কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না।

বরং ঘটছে উল্টোটাই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন অঞ্চল থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে বদ্ধ পরিকর। আরও অভিযান চালাতে পারে।

এদিকে, সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ মিয়ানমার সরকারের এই অভিযানকে নৃশংস সামরিক অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘ বলছে, এই হত্যাযজ্ঞ জাতিগত নিধনের বড় উদাহরণ।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ‘জাতিগত নিধনের’ মতো কঠিন শব্দের ব্যবহারের পরও অবস্থান বদলাবেন না মিন অং। ২০১১ সাল থেকেই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। মিয়নামারের নেতৃত্বের পদবিতে তিনি অষ্টম স্থানে থাকলেও তিনিই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী।  কারণ দেশটির প্রতিটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ক্ষমতা রয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতা দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা অং সান সু চি’র হাতে ন্যস্ত। তিনি দেশটির ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ অব ডেমোক্র্যাসি দলের নেতা ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা। ২০১০ সালে মুক্তির আগ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে কয়েক দশক কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি।

সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক সরকারের পরিণত হলেও মিয়ানমারের সংসদের ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণও সেনাবাহিনীর হাতে।

ইয়াঙ্গুনভিত্তিক এক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ দিজ উইক ইন এশিয়াকে বলেছেন, হঠাৎ করে থামতে যাবেন জেনারেল? সেনাবাহিনী পরিস্থিতিকে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জেনারেল থামানোর মতো খুব কম সুযোগ রয়েছে। তিনিই দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ।

গত তিন সপ্তাহের এই সামরিক অভিযান আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাবে পরিচালিত হচ্ছে দাবি করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বিপরীতে আরসা নিজেদের রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইরত আত্মরক্ষা গোষ্ঠী হিসেবে দাবি করে।

মিয়ানমারের উত্তরপূর্ব রাজ্য রাখাইনের বাসিন্দা ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান। কিন্তু সরকার দাবি করে আসছে, তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আরসার অস্ত্রশস্ত্র খুব দুর্বল। আগস্টের হামলাটি ছোটো আগ্নেয়াস্ত্র ও তলোয়ার দিয়ে চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর পাল্টা হামলা ছিল হুমকির তুলনায় অনেক বেশি  শক্তিশালী।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান ফিল রবার্টসন বলেন, সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর উচিত, মিয়ানমারের সিনিয়র জেনারেল মিন অং হিলাইং ও অন্য সিনিয়র কমান্ডারদের এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, তারা গভীর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যদি না দ্রুত এই নৃশংসতা বন্ধ করা না হয়।

বৃহস্পতিবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নতুন স্যাটেলাইট ছবি দিয়ে অগ্নিকাণ্ডের তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে। একইসঙ্গে সংস্থাটি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও প্রকাশ করে। যেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে পোড়ানোর অভিযান চালানোর ছবি রয়েছে।

সংস্থাটির আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিরানা হাসান বলেন,  মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগাচ্ছে, এগুলো অকাট্য প্রমাণ। কোনও ভুল করবেন না, এটি জাতিগত নিধন।

বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন, আরসাকে একেবারে নির্মূল না করা পর্যন্ত জেনারেল মিন থামবেন না।

জেনারেল মিনের বিরুদ্ধে সেনবাহিনীর মধ্যে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকলেও ভারত, অস্ট্রিয়া, জাপান ও জার্মানি সম্প্রতি তাকে লাল গালিচা অভ্যর্থনা দিয়েছে। বিদেশি সরকারগুলো দেশটির সেনাবাহিনীকে সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো মিয়ানমার ও দেশটির সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। ভারতভিত্তিক মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ নেহজিনপাও কিপজেন জানান, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সর্বসম্মত নিন্দা প্রস্তাব মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জন্য কার্যকর চাপ হতে পারে। কিন্তু এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ ভেটো ক্ষমতাধর চীন মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র, রাশিয়াও সমর্থন করছে। এ ধরনের কোনও প্রস্তাব এলে চীন-রাশিয়া আটকে দেবে।

বুধবার ১৫ সদস্যের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের অনুরোধে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর রাখাইনে সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে এবং ত্রাণকর্মীদের সেখানে নিরাপদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব মিসর উত্থাপন করেছিল, চীন তাতে সমর্থন দেয়নি। যদিও ৯ বছরের মধ্যে মিয়ানমার নিয়ে এই প্রথম নিরাপত্তা পরিষদ কোনও বক্তব্য দিল।

এছাড়া মিয়ানমারের সরকার পরিচালিত দৈনিক পত্রিকা গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছে চীন।

চীনা রাষ্ট্রদূত হং লিয়াংকে উদ্বৃত করে পত্রিকাটি লিখেছে, রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলায় চীনের অবস্থান পরিষ্কার, এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। উগ্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণ ও মানুষকে সহযোগিতা করায় সরকারকে অভিনন্দন।

মিয়ানমারভিত্তিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ জানান, বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রাখাইন অঞ্চলে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। টিলারসনের মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাখাইনের সহিংসতা চরম অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের করণীয় কাজ করেছে। এখন পশ্চিমা ও এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সমালোচনা করতে হবে।

কিপজেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে এই দুটি দেশই মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে থামানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Check Also

‘এখনও স্থল মাইন পুঁতছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী’

অনলাইন ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এখনও বাংলাদেশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *