Thursday , October 19 2017
হোম / জাতীয় / অবাধে চলছে ফরমালিন ব্যবসা, পঁচে যাচ্ছে মানবদেহ, হাত-পা বাধা ম্যাজিস্ট্রেটের

অবাধে চলছে ফরমালিন ব্যবসা, পঁচে যাচ্ছে মানবদেহ, হাত-পা বাধা ম্যাজিস্ট্রেটের

মুহাম্মদ আমিন : খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় জমে উঠেছে ফরমালিন ব্যবসা। সতেজ এবং দীর্ঘ সময় তরতাজা রাখতে অবাধে মাছ, ফল এবং শাকসবজীতে প্রয়োগ করা হচ্ছে এসব কেমিক্যাল। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলেন ফরমালিন ছাড়া ফল, মাছ এবং শাকসবজী নেই। বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদ এলাহী বলেন, ভেজাল বিরোধী অভিযান ২ মাসের জন্য স্থগিত করেছেন আদালত।

তবে অভিযান পরিচালনা করার আদেশও বহাল রেখেছেন। কিন্তু ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাকালে ফরমালিন সনাক্তকরণ কোন মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। প্রশ্ন ছিল কিভাবে বোঝা যাবে যে ফল, মাছ, শাকসবজী এবং বিরানীতে কেমিক্যাল নেই। উত্তরে বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন হাতে-নাতে ধরা ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছেনা। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ানম্যান মো. মাহফুজুল হক বলেন, দেশে খাদ্যে কোন ভেজাল নেই এবং ফরমালিন আমদানি বন্ধ রয়েছে। তার এমন দাবির প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে যাওয়া হয় রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায়। কথা বলা হয় খুচরা ফল ব্যবসায়ীদের সাথে। তারা জানান, ফরমালিন ছাড়া কোন ফল নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিশেষজ্ঞ ডা: ফারুক আহ্মেদ বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্যে অতিমাত্রা ফরমালিন প্রয়োগ করে থাকে। ফরমালিনযুক্ত খাবারে মানবদেহে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুকিঁ বাড়ে। ডায়াবেটিস মানবদেহের একটি পচনশীল রোগ।

সরেজমিন দেখা গেল কাক ফাটা রোদে ফলের রং কিছুটা পরিবর্তন হলেও প্রবল বর্ষণে রং আরো উজ্জল হয়। মিটফোর্ড এলাকায় দায়িত্বরত কতোয়ালি থানার এএসআই মন্জুর সাথে ফরমালিন অনুসন্ধানে তার সহযোগিতা চাওয়া হলে তিনি সার্বিক সহযোগিতার আশ^াস দেন। ফরমালিনের বিষয়ে তিনি বলেন,বাদামকলী এবং মিটফোর্ড এলাকায় এই সব কেমিক্যালে সয়লাব। তবে দায়িত্বরত এই পুলিশ বলেন, কেমিক্যাল ব্যবসায়ী এবং ফল ব্যবসায়ীদের অনেক উপরে হাত রয়েছে। অনুসন্ধানের বিষয়টি তাকে অবহিত করে যাওয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের গেটের অপজিটে মমতাজ মার্কেট, ২১৮ মিটফোর্ড রোড, ঢাকা। ওই ভবনটি পাঁচ তলা। পুরো ভবনটিই কেমিক্যাল ব্যবসায়ী। গত ৭ সেপ্টেম্বর বৃহষ্প্রতিবার মমতাজ মার্কেটে ফরমালিনের তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া হয় আজাদ কেমিক্যাল কোম্পানিতে। ঈদের ছুটির পর দোকান পাট প্রায়ই বন্ধছিল। আজাদ কেমিক্যালের দোকান খোলা থাকলেও ছিল না কোন কর্মচারি। দায়িত্ব পালনে দোকান খুলে বসেছিলেন ম্যানেজার মো. খোকন মিয়া। তাদের সাথে ফরমালিনের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করা হয়। প্রস্তাব দেয়া হয় মাসে ১০ লাখ টাকার কেমিক্যাল আপনার দোকান থেকে ক্রয় করা হবে। প্রথমে তিনি ফরমালিন বিক্রি করা হয় না বলে অস্বীকার করেন। মোবাইলে কল রেকর্ড দিয়ে আলাপ হয় ম্যানেজার খোকনের সাথে। অনুসন্ধান প্রতিবেদকের কাকুতি মিনতির পর আজাদ কেমিক্যালের ম্যানেজার স্বীকার করেন এবং বলেন আমাদের কাছে ইন্ডিয়ান এবং জার্মানের ফরমালিন আছে। যার প্রকৃত নাম পেরা বলা হয়।

দুটিই তরল কেমিক্যাল। ভারতীয় যে কেমিক্যাল তার মূল্য ৩৫০ টাকা কেজি এবং জার্মানের কেজি ৪৫০ টাকা। খোকনের নিজের হাতের লেখা মূল্য তালিকা। তবে তিনি হাতে হাতে ফরমালিন দিতে নারাজ। তার বিকাশ একাউন্ট নং-০১৭৫৫৬৫৩১১০। এই একাউন্টে টাকা পাঠালে এস,এ পরিবহনে মাল রাজশাহীতে পাঠাবেন। তার সাথে আলাপকালে একজন হারবালের ব্যবসায়ী এলেন ফরমালিন ক্রয় করতে। ক্রেতার চাহিদার ওই কেমিক্যাল তার কাছে নেই। ক্রেতা জানালেন পচনশীল রক্ষায় হারবালের তরল ঔষধ এবং হালুয়াতে এই কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। আজাদ কোম্পানির ম্যানেজারের কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনাদের কেমিক্যাল বাদামতলী ফলের আড়দারেরা নেয় কিনা। তিনি বলেন প্রতি জেলাতেই আমাদের ফলমালিন (পেরা) যায়। তার দেয়া তথ্যেও সূত্র ধরে যাওয়া হয় বাদামতলী ফলের আড়ৎ মের্সাস এস, এম এন্টারপ্রাইজে যার আড়ৎ নং-১৯/৪ শাহাজাদা মিয়া লেন।

আড়ৎ মালিক গোপাল, সুমন এবং উত্তম কেউ উপস্থিত ছিলেন না। ফল বিক্রি করছিলেন তার কর্মচারিরা। তারা বলেন, মালিক সাউথ আফ্রিকা এবং চায়না থেকে এ সব ফল আমদানি করেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর ওই আড়তে ব্যবসায়ীক হিসেবে যাওয়া হয়। ওই দিনই সাউথ আফ্রিকা থেকে গোপালের আড়তে জাহাজে ফলের চালান আসে। কর্মচারিরা জানালেন, সাউথ আফ্রিকা থেকে এই আপেল আসতে তিন মাস সময় লেগেছে। জানতে যাওয়া হয় ফরমালিন দিবেন কিনা। উত্তরে বললেন ওই খান থেকে একেবারেই কেমিক্যাল দিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হকের সাক্ষাতকার নিতে তার দপ্তরে যাওয়া হয় গত ৬ সেপ্টেম্বর। তিনি ব্যস্ত থাকায় কথা বলতে পারেননি। ওই দিন তার মোবাইল নাম্বারে ফোন দিয়ে ফরমালিন নিয়ে তার ইন্টারভিউ নিতে চাইলে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, মন গড়া কোন রিপোর্ট লিখলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পিরাপিরির এক পর্যায়ে তিনি বলেন, বৃহষ্প্রতিবার ব্যস্ত থাকবো। দশ সেপ্টেম্বর রোববার তিনি সাক্ষাকার দিতে রাজি হন। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল রয়েছে কিনা। এক কথায় তিনি উত্তর দেন বর্তমানে দেশে কোন ভেজাল খাদ্য নেই। ওই দিনও হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, মিথ্যা বা বানোয়াট কিছু লিখলে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চেয়ারম্যান দাবি করেন, মাছ,ফল, শাকসবজী এবং খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পর ব্যবসায়ীরা এই কেমিক্যাল ব্যবহার করছেনা এবং ফরমালিন আমদানি বন্ধ রয়েছে। তার এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেশে অবাধে ইন্ডিয়া এবং জার্মান থেকে ড্রামকে ড্রাম ফরমালিনের প্রকৃত নাম পেরা নিরাপদেই আমদানি করছেন কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। যার প্রমান সংরক্ষিত রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয় আপনার দপ্তর কর্তৃক কোন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেছেন কিনা।

তিনি বলেন, বেশ কয়েকবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। তার কথার সত্যতা যাচাই করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা হাসান মেহেদীকে ফোন দেয়া হয়। জানতে চাওয়া হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে কিনা। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হক দাবি করেন, ২০০৯ সালের আইন আমাদের। এই প্রতিষ্ঠানের আইন ব্যবহার করছেন বিএসটিআই এবং জেলা প্রশাসক। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইন ব্যবহারের বিষয় নিশ্চিত হতে ফোন করা হয় বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালকের পিএস মো. রিয়াজুল হককে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম আর বিএসটিআই কত সালে প্রতিষ্ঠিত। এতটুকু বিবেচনা করলেই বুঝা যাবে কে কার আইন দ্বারা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে। ভেজাল বিরোধী অভিযান বন্ধের বিষয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালকের পিএস মো. রিয়াজুল হক বলেন, আদালত ভেজাল বিরোধী অভিযান ২ মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। যার মেয়াদ শেষ হবে ২ অক্টোবর। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত এডিএম শরিফ রায়হান কবির বলেন, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা চলমান রয়েছে।

এদিকে ডোয়াবেটিসের কারণ জানতে যাওয়া হয় শাহবাগ বারডেম জেনারেল হসপিটালে। দুই দিন ঘুরে বারডেম একাডেমির পরিচালক প্রফেসর জাফর আহমেদ লতিফের সাক্ষাত পাওয়া গেল। জানতে চাওয়া হয় কি কারণে ডায়াবেটিস হয় এবং এই রোগে মানবদেহের কি কি ক্ষতি হয়ে থাকে। উত্তরের প্রথমেই তিনি তার দায় সেরে নিয়ে বলেন, যেহেতু আমার হাতে প্রমান নেই। সেই অবস্থান থেকে বলা যায় দুটি কারণে মানুষের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। প্রথমত বংশ গত দ্বিতীয়ত ওজন বেড়ে যাওয়ায়। এ রোগের ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ডায়াবেটিস মানুষের সর্বাঙ্গ বিকলঙ্গ হয়ে যায়। এছাড়া অন্ধ হয় চোখ ও কিডনি অচল হয়ে পরে, ক্ষত স্থানে পচে যায় ও হৃদরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। তবে তার উত্তরের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে ডায়াবেটিস হওয়ার গোপন রহস্য। বৈজ্ঞানিক প্রমান না থাকায় তিনি সুকৌশলে উত্তর দিয়েছেন। ফরমালিনে মানবদেহের ক্ষতির বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান কিডনি বিশেষজ্ঞ নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের ঝুকিঁ বাড়বে, গেষ্ট্রিক আলসার ও মস্তিষ্কের স্মৃতি বিভ্রাট ঘটে। তিনি জানান, প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন রোগীকে কিডনি ডায়ালসেস করা হয়।

ফরমালিনে ক্ষতির বিষয় নিয়ে কথার এক পর্যায়ে বারডেম জেনারেল হসপিটালের বারডেম একাডেমি বিভাগের পরিচালকের পিএস মাহবুব বলেন, ডায়াবেটিসের মূল কারণ আপনে যে বিষয়ে সারের সাক্ষাত নিতে আসছেন। সেটাই মানবদেহকে পচন ধরায়। খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট বিভাগের পরিচালক ড. জহুরুল হক জানান ফরমালিনের বিকল্প প্রিজারভেটিব কেমিক্যাল আবিস্কার করেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ। মাছ, ফল এবং শাকসবজী সতেজ রাখতে বিষাক্ত ফরমালিন আর ব্যবহার করতে হবে না। তিনি বলেন, ভোগ্যপণ্য দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে এই কেমিক্যাল নিয়ে আরো গবেষণা করা হচ্ছে। প্রিজারভেটিব ব্যবহারে মানবদেহের কোন ক্ষতি হবে না। ফরমালিনযুক্ত এ সব খাবারে মানবদেহের ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে জানান,বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যানফারুক আহ্মেদ।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা কমিশনের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ১ সপ্তাহ আগে টেবিলের ড্রয়ারে ভুলে এই আপেল রেখে যাই। ১৪ তারিখে ড্রয়ার থেকে ওই আপেল বেড় করে বলেন, যেভাবে রেখে গেছি সে রকম সতেজ রয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ২২/১ দক্ষিণ মুগদার ফল ব্যবসায়ী মো. সোলাইমান মোল্লা ঢাকার ডাকের প্রতিবেদককে বলেন, তার দোকানে আপেল, মালটা, আনার এবং নেসপতি ফল রয়েছে। তিনি হলফ করে বলেন, ফরমালিন ছাড়া কোন ফলে নেই। একই এলাকার মাছ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান, ইন্ডিয়া এবং বার্মা থেকে যে সব মাছ আমদানি করা হয় সেই সব মাছে কেমিক্যাল দেওয়া থাকে।

Check Also

দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন

ঢাকার ডাক ডেস্ক : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় আত্মসমর্পণ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *