Saturday , November 25 2017
শিরোনাম
হোম / জাতীয় / রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ কি সম্ভব?

রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ কি সম্ভব?

অনলাইন ডেস্ক : রাজধানীতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে যানজট। এই যানজটের প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি। রাজধানীতে প্রতিদিন যে পরিমাণ যাত্রী চলাচল করেন এর মধ্যে ৬ থেকে ৮ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করেন। বাকি যাত্রীরা গণপরিবহন (বাস ও মিনিবাস), রিকশা, মোটরসাইকেল এবং পায়ে হেঁটে চলাচল করেন।  নগর বিশেষজ্ঞ, গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলকারী ছয় শতাংশ মানুষ ঢাকার ৭৬ ভাগ সড়ক দখল করে আছে।  নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট সড়কের ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ থাকে ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। গণপরিবহনের দখলে থাকে ৬ থেকে ৮ শতাংশ। সড়কের বাকি অংশ বিভিন্নভাবে অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিয়ের দখলে থাকে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান বলেন, ‘এক  গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার  ৬০ থেকে  ৬৫ ভাগ সড়ক দখল করে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি। আর গণপরিহন দখল করে মাত্র ৭ শতাংশ রাস্তা।  বাকি অংশ দখল করে আছে  অন্যান্য গাড়ি, অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিং।’

ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে রাখে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্জ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতি ১০ স্কয়ার ফুট জায়গাতে মাত্র  দু’জন মানুষ চড়তে পারেন। অন্যদিকে, গণপরিবহনে একই পরিমাণ জায়গায় বসে ও দাঁড়িয়ে ১৫/১৬ জন যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেই হিসেবে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি, তা ঢাকার রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখল করে। বাকি অংশ থাকে গণপরিবহন ও  অবৈধ দখলে।’

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হলেও কিভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে কোনও  নির্দেশনা নেই। তবে নগর বিশেষজ্ঞ এবং গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলছেন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে তার আগে পাবলিক সার্ভিস (গণপরিবহন) বাড়াতে হবে এবং উন্নত সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে দুটি ধাপে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ধাপে গণপরিবহনকে শক্তিশালী করতে হবে। তার আগে সরকারকে গণপরিবহন বাড়াতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত সড়ক ঘোষণা করতে হবে। সড়কে গণপরিবহনের জন্য আলাদা লেন তৈরি করে, তাতে চলাচলের জন্য সুব্যবস্থা করতে হবে।

এছাড়া নারীদের জন্য আলাদা গণপরিবহনের ব্যবস্থা, অন্য গাড়িগুলোতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাড়ানো। নারী যাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, তার ব্যবস্থা করা।  মেট্রোরেল, পাতালরেল সার্ভিস চালু করা। রাজধানীতে রিকশার সংখ্যা কমানো। গলির মধ্যে চলাচলের জন্য ছোট মিনি বাসের ব্যবস্থা করা। সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়া নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা মনিটর করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথম পদক্ষেপ হবে গাড়ি আমদানিতে ট্যাক্স বাড়ানো। পার্কিং চার্জ বাড়াতে হবে। ব্যস্ত এলাকায় প্রবেশের জন্য আলাদা ফি আদায় করতে হবে। গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানির দাম কয়েকগুণ বাড়াতে হবে । ব্যক্তিগত গাড়িতে নতুন করে আর কোনও সিএনজি সংযোগ না দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একটি পরিবার কতটি গাড়ি রাখতে পারবে, তাও নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। আমাদের সরকারও এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা ।

তারা আরও বলছেন, মানুষ কেন ব্যক্তিগত গাড়ি কেনে? এর অন্যতম কারণ গণপরিবহনের সুব্যবস্থা না থাকা। আগে গণপরিবহন বাড়াতে হবে। তবে শুধু গণপরিবহন বাড়ালেই চলবে না। এর সেবার মান ও চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকায় গত  আগস্ট পর্যন্ত  বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৫০ হাজার ৭০৮টি। এর মধ্যে প্রাইভেট কারের সংখ্যা ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬২২টি।  অর্থাৎ  মোট যানবাহনেরএক চতুর্থাংশই প্রাইভেট কার।  জিপ রয়েছে ৩৫ হাজার ৮৪০টি।  এগুলোও ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ হিসাবে প্রাইভারের কারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৬২টি। মিনিবাসের সংখ্যা ১০ হাজার ৩৬২টি। গড়ে দৈনিক ৬০টি প্রাইভেট কার নিবন্ধন হচ্ছে ঢাকায়। প্রতিদিন গড়ে ১২টি বাস ও মিনিবাস নিবন্ধিত হয় রাজধানীতে।  নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা মোট ৩০ হাজার ২৭৪ টি। তবে এর অধিকাংশ দূর পাল্লার পথে চলাচল করে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির হিসাবে রাজধানীতে গণপরিবহন হিসেবে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘রাজধানীতে গণপরিবহন হিসেবে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি হবে না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড.সরওয়ার জাহান বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে গণপরিবহন সার্ভিস বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনের সার্ভিসের মান সুনিশ্চিত করতে হবে। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িতে নতুন করে  সিএনজি সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে।  এটা বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। এর বাইরে গাড়ি আমদানিতে ট্যাক্স বাড়াতে হবে। গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ির তেলের দাম কয়েকগুণ বাড়াতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘চীনে গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ির মালিককে  পেট্রোলের দাম ৭০ শতাংশ বেশি দিতে হয়। এটা করা হলে মানুষ খরচ কমাতে গণপরিবহন ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দেবে।’

ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আমদানি ট্যাক্স বাড়ানোর কথা জানিয়ে  বুয়েটের অধ্যাপক ও  গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ  ড. শামছুল হক  বলেন,‘ এ ছাড়াও রেজিস্ট্রেশন ফ্রি বাড়ানো এবং কঠিন শর্ত আরোপ করা যেতে পারে।  গণপরিবহনের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন তৈরি করা দরকার। মেট্রোরেল, পাতালরেল সার্ভিসের ব্যবস্থা করতে হবে।’

এতসব শর্ত আরোপ করা হলে নতুন পরিবার কিভাবে গাড়ি ক্রয় করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কেন ক্রয় করে। নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলে জন্য। এটা যদি আপনি গণপরিবহনে ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত হবে। তাই আগে গণপরিবহন বাড়াতে হবে এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে।’

বিআরটিএ’র পরিচালক (প্রশাসন) মশিয়ার রহমান বলেন, ‘প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণের আইনটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। মতামতের জন্য এটি এখন আইনমন্ত্রণালয়ে আছে। এরপর আমাদের হাতে আসলে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আমরা দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেবো।’

প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে- ‘সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে  ব্যক্তি বা পরিবার বা প্রতিষ্ঠান বা এলাকার জন্য মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে।’ তবে কিভাবে এটি করা হবে আইনে তার কোনও ব্যাখা নেই।

ওয়ার্ক বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মারুফ রহমান বলেন, ‘প্রাইভেট কার পার্কিংয়ের জন্য ১৬০ বর্গফুট জায়গা নেয় এবং ৯০ ভাগ সময় পার্কিং অবস্থায় থাকে। কিন্তু দিন শেষে সার্ভিস চার্জ দিতে হয় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আপনি এটাকে ৫০০ টাকা করে দেন । দেখবেন মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি বের করবে না। তবে সবার আগে গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে গণপরিবহনে চলাচল করতে পারে। নারীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা  বলছেন,সবার আগে  রাস্তা অবৈধ  দখলমুক্ত, অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। এছাড়া, ঢাকার নৌপথ দখলমুক্ত করে চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের চলাচলের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। তাহলে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে।

অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, ‘ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে করে যানজট নিরসনে করা যাবে না। এতে বরং ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহিত করা হয় ।’

গত ২৬ জুলাই বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়- যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।  এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলে। গত ১০ বছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিল প্রতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার।  বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর মানুষ হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে । বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালে এই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

Check Also

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কেরানীগঞ্জে জমি ইজারা পেল যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক :  ভ্রাম্যমাণ ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *