Friday , November 24 2017
শিরোনাম
হোম / উপ-সম্পাদকীয় / বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা এবং ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতালিপ্সা

বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা এবং ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতালিপ্সা

অনলাইন ডেস্ক :  গ্রীসে গণতন্ত্রের চর্চা প্রথম শুরু হয় শহরগুলিকে কেন্দ্র করে। গ্রীক শব্দ ‘DEMOKRATIA’ (Rule of the people) থেকে ‘গণতন্ত্র’ শব্দের উৎপত্তি। তৎসময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র ছিল নিন্মরূপ: The ‘majority rule’ is often described as a characteristic feature of democracy but without governmental or constitutional protections of individual liberties, it is possible for a minority of individuals to be oppressed by the Ôtyranny of the majorityÕ. An essential process in representative democracies is competitive elections that are fair both substantively and procedurally. Furthermore, freedom of political expression, freedom of speech, and freedom of the press, civil liberties are essential so that citizens are informed of what exists to their benefit and detriment and thereby be able to vote in their personal interests which are inclusive of general interest for all.
সক্রেটিসের ভাবশিষ্য প্লেটোই প্রথম Rule by the governed এর ব্যাখ্যায় রাজতন্ত্রের পরিবর্তে একটি ভিন্নতর শাসনব্যবস্থার কথা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিষ্টল Science of logic অথবা Rules of Reasoning এর পক্ষে মতাদর্শ প্রকাশ করেন। ‘মানুষের জীবনধারা কী হওয়া বাঞ্চনীয়’ এ চিন্তা ধারার উপর গুরুত্ব দিয়ে প্লেটো গবেষণা করেন। অন্যদিকে মানুষের জীবনধারার সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে এরিষ্টটল গবেষণা করে তার মতামত ব্যক্ত করেন। ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আইসল্যান্ড (Ice Land) প্রথম লিখিত একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন যাতে গণতান্ত্রিক ভাবধারায় একটি সাধারণ পরিষদ (এবহবৎধষ অংংবসনষু)-কে কেন্দ্র করে সরকার পরিচালনার বিধান রাখা হয়।
৬৩টি ধারা সম্বলীত The Great Magna Carta ঘোষণার মাধ্যমে ঘোষিত হয় যে, রাজা/রানী আইনের আওতাভুক্ত, এর ঊর্র্ধ্বে নয়। তখন থেকেই গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি শুরু। খ্রিস্টপূর্ব ৬৪০-৫৬০ সালে এথেন্সের চিফ ম্যাজিস্ট্রেট Aristocrats মতবাদ চালু করেন যা Aristocracy means Rule by the Best. যেখানে সমাজের উচ্চবিত্তদের কল্যাণ ও উন্নত জীবন ব্যবস্থার কথা রয়েছে।
অনেক মণীষী/রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন বটে। কিন্তু গণতন্ত্রের কবর অনেকবারই রচিত হয়েছে গণতন্ত্র রক্ষার নামে। গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে তাদের হাতেই যারা গণতন্ত্রকে রক্ষার নাম করে ক্ষমতায় বসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্রের হাওয়া পৃথিবীতে একই রকমে বয়ে যায়নি। ১৮৭০-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমা রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ধারা শুরু হয় যা ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পৃথিবীতে এখন কোথাও মিশ্র গণতন্ত্র, কোথাও গণতন্ত্র, কোথাও রাজতন্ত্র এবং কোথাও সেনাশাসন চলছে। তবে ইংলেন্ডে মিশ্র গণতন্ত্র হলেও সেটাই বেশি গ্রহণযোগ্য। ইংলেন্ডের রানী বা রাজপরিবার দ্বারা নিজ দেশে কারো নির্যাতিত হওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে গণতন্ত্রের তাগিদ ছিল অত্যন্ত প্রকট। কিন্তু স্বাধীনতার ৪ বছরের মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসন ঘোষিত হওয়ার মধ্যে দিয়েই গণতন্ত্র বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হয়। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রদান করেছেন। তবে মানুষের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকেই গণতন্ত্রের মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ মর্মে দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলতে দেয়ার জন্য জীবন দিতে পারি।’ গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা সম্পর্কে এ দেশের সাধারণ মানুষ একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করেছিল তা হলো, ‘আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশী তাকে দিবো’, যার ফলে ‘সংবিধান (ত্রোয়োদশ সংশোধন) আইন’ ১৯৯৬’ মোতাবেক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে সংযোজন করা হয়। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে যতগুলি নির্বাচন হয়েছে তাতে দুটি বৃহৎ দলই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ২৮ ডিসেম্বর/২০০৮ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করেই উক্ত পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দেশে নেমে আসে চরম বিশৃঙ্খলা যার প্রতিফলন ঘটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৫ জানুয়ারি/২০১৪ তারিখের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। ঐ নির্বাচনে ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৫৪ জনই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়। ভারতের প্রভাবেই ওই একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব ও বিচার বিভাগ (নিন্ম আদালত) প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নেয়ার ফলে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলের আন্দোলন একতরফা নির্বাচন ও সরকার গঠন প্রতিরোধ করতে পারেনি।
২০১৯ সালের নির্বাচন কেমন হবে, এ নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। যেহেতু ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জাতির রয়েছে সে কারণেই মানুষ মনে করে যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) ধারা মোতাবেক সমস্ত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর উপর ন্যস্ত রয়েছে। ফলে যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকেন তার অধীনেই থাকে প্রশাসন এবং প্রধানমন্ত্রীর পূজা করা ছাড়া প্রশাসনের বিবেক অন্য কোন কাজ করে না।
ক্ষমতা গ্রহণ ও অধিষ্ঠিত থাকা মানুষের মজ্জাগত অভ্যাস। ক্ষমতাসীনরা যখন স্বৈরাচারে পরিণত হয় তখনই মানুষ এর পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করে, ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় একটি রূপরেখা তৈরি করে, পর্যায়ক্রমে যা আইনে পরিণত হয়। তেমনি ‘আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশী তাকে দিবে’, এ শ্লোগান থেকেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন পদ্ধতি সাংবিধানিক স্বীকৃত পেয়ে আইনে পরিণত হয়।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু নৈতিকতার পরিবর্তন হয়নি। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এ আর্দশের ভিত্তিতেই দেশ চলছে। ব্যতীক্রম কিছু ঘটেছে যেখানে মিডিয়া জোরালো ভ‚মিকা রেখেছে। সিলেটের রাজন হত্যা, নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন, প্রভৃতি বিচার হয়েছে একমাত্র মিডিয়ার বদৌলতে। কিন্তু দুঃখজনক এই যে, মিডিয়া নেতৃত্বও রাজনৈতিক কারণে দ্বিধাবিভক্ত। সত্য কথা এবং ইনসাফের কথা এখন কেউ বলতে চায় না। কোন কথাটি বললে বক্তা লাভবান হবে সে কথাটি বলতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। আবার সাধারণ মানুষ যা উপলব্ধি করে নিরাপত্তার কারণে তাও বলতে চায় না। এ বিষয়গুলিই রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতাসীনদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে দিনে দিনে শাসকদের স্বৈরাচারে পরিণত করে।
ক্ষমতাসীনরা কোন কারণেই ক্ষমতাহীন হতে চায় না। তাদের অর্জিত সম্পদ রক্ষা করাটাও এর অন্যতম কারণ। অন্যদিকে ক্ষমতায় থেকে যেসব অপকর্ম, অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার করে তার প্রতিশোধের আশংকা থেকেও ক্ষমতাসীনরা ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে চায়। ফলে তারা অপকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের পদ্ধতিকে সংবিধান থেকে রদ ও রহিত করা অনুরূপ একটি অপকৌশল মাত্র। কিন্তু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন পদ্ধতি সংবিধানে সংযোজন ছিল একটি আন্দোলনের ফসল।
লেখক: কলামিস্ট ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা

Check Also

জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে নিজের ফর্মুলা নিয়ে শেখ হাসিনা এখন এত ভীত কেন?

অনলাইন ডেস্ক : দেশে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন কোনো সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে এ নিয়ে দেশের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *